অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় অস্ত্রোপচার শুরু করা যায়নি।
চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রায় কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে এক্স–রে সেবা, বিকল হয়ে আছে আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্র। অস্ত্রোপচারের জন্য অপারেশন থিয়েটার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসক না থাকায় শুরু করা যায়নি কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার। এতে হাওরবেষ্টিত ধর্মপাশা ও পাশের মধ্যনগর উপজেলার তিন লক্ষাধিক মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন।
প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৪০০–৪৫০ রোগী চিকিৎসা নেন। তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ৯০–১০০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। আর ভর্তি থাকেন গড়ে ৫৫–৬০ জন। চিকিৎসক–সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
১৯৭৮ সালে ৩১ শয্যা নিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে বাড়েনি প্রয়োজনীয় জনবল। দুটি ভবনে হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর একটি ভবনে বহির্বিভাগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও জরায়ুমুখের ক্যানসার পরীক্ষাকেন্দ্র এবং প্রসূতিদের সেবাকেন্দ্র রয়েছে। অন্য ভবনে রয়েছে অপারেশন থিয়েটার ও আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষ। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় অপারেশন থিয়েটারটি কোনো কাজে আসছে না।
চিকিৎসকের ২৫টি পদ শূন্য
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, এখানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১১ জন, শূন্য রয়েছে ২৫টি পদ। শূন্য পদগুলো হলো জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি অ্যান্ড অবস), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি), জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিয়া), ৬ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ৩ জন ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসার, ১০ জন সহকারী সার্জন, ১ জন মেডিক্যাল অফিসার (অপথালমোলজি)। এ পদগুলো কয়েক বছর ধরে শূন্য আছে।
এ ছাড়া নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার, অফিস সহকারী, ওয়ার্ডবয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, এখানে চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৬টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১১ জন, শূন্য রয়েছে ২৫টি পদ।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শুভেন্দু শেখর দাশ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৪০০–৪৫০ রোগী চিকিৎসা নেন। তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জরুরি বিভাগে প্রতিদিন ৯০–১০০ জন রোগী চিকিৎসা নেন। আর ভর্তি থাকেন গড়ে ৫৫–৬০ জন। চিকিৎসক–সংকটের কারণে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
প্রসূতিদের অস্ত্রোপচারে যেতে হয় নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জে
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে ৫০–৬০ জন প্রসূতি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের জন্য এখানে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় তাঁদের নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে হয়। এতে প্রত্যেকের খরচ হচ্ছে ২৫–৩৫ হাজার টাকা।
জনবল সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসেই লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত আছে।
সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, ‘এক সপ্তাহ আগে আমার বোনের মেয়েরে নিয়া সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালও আইনা ভর্তি করছিলাম। ডাক্তার পরীক্ষা–নিরীক্ষা কইরা কইছে, সিজার লাগব। পরে হেরে লইয়া আমরা নেত্রকোনা গিয়া সিজার করাইছি। বেকতায় মিইল্যা ৩০ হাজার টেহা খরচ অইছে।’
সরেজমিনে যা দেখা গেল
গতকাল সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ভবনের বহির্বিভাগে রোগীদের ভিড়। এক্স–রে ও আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষে তালা ঝুলছে। অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে আছে। হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪১ জন রোগী। তাঁদের মধ্যে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত নয়জন এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত চারজন। ডায়রিয়া রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় বারান্দায় তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ৫০টি শয্যা থাকলেও অনেককে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় জোড়াতালি দিয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসাসেবা চালাতে হচ্ছে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুবীর সরকার। তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, এক্স–রে যন্ত্র থাকলেও জনবল না থাকায় সেবা বন্ধ। আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রটি প্রায় এক মাস ধরে বিকল। এটি মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে যোগাযোগ করা হয়েছে। ইসিজি করারও প্রয়োজনীয় জনবল নেই।
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বলেন, জনবল সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রতি মাসেই লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত আছে।