হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাবার, শরীরচর্চা ও মানসিক চাপের পাশাপাশি ঘুমের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করলে তা রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বিশেষ করে, আপনি যদি রাতে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমাতে যেতে পারেন, তাহলে এটা আপনার হৃদস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সবার জন্য একই সময় ঘুমাতে যাওয়ার নিয়ম নেই। প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করতে পারছেন কি না সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুম জরুরি কেন?
আমাদের দেহের ভেতরের বিভিন্ন কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম অনুসরণ করে কাজ করে। ঘুম, হজম, শরীরের তাপমাত্রা ও হরমোন নিঃসরণের মতো বিষয়গুলো নির্দিষ্ট ছন্দের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। রক্তচাপেরও নিজস্ব একটি ছন্দ থাকে। ঘুমের সময় অনিয়মিত হলে এর ছন্দপতন হতে পারে।
সাধারণত ঘুম থেকে ওঠার পর রক্তচাপ বাড়তে শুরু করে আর ঘুমের সময় তা কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রাত ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে ঘুমাতে যান, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। অন্যদিকে, নিয়মিত রাত জাগলে বা মধ্যরাতের পর ঘুমাতে যাওয়ার সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে রাত ১০টা বা ১১টার মধ্যে ঘুমাতে পারলেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। নিজের ঘুম থেকে ওঠার সময় অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের সময় রক্তচাপ কমে যায় কেন?
সাধারণত ঘুমের সময় রক্তচাপ দিনের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমে যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রক্রিয়াকে ‘নকটার্নাল ডিপিং’ বলা হয়।
এ সময় হৃদস্পন্দন ধীর হয়ে রক্তনালি শিথিল হতে পারে। ফলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ কিছুটা কমে আসে। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ।
তবে সবার ক্ষেত্রে ঘুমের সময় রক্তচাপ একইভাবে কমে না। কারও কারও ক্ষেত্রে রাতে রক্তচাপ প্রত্যাশিত মাত্রায় কমে না। এই অবস্থাকে নন-ডিপিং বলা হয়। এমন পরিস্থিতির সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও হার্ট ফেইলিওরের মতো হৃদরোগজনিত জটিলতার ঝুঁকির সম্পর্ক আছে।
প্রতিদিন ঘুমানোর সময় পরিবর্তন করলে কী হয়?
কোনো দিন রাত ১০টায়, আবার কোনো দিন রাত ২টায় ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ঘুমানোর সময় এবং ঘুম থেকে ওঠার সময় পরিবর্তিত হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে যারা রাতের শিফটে কাজ করেন বা নিয়মিত ঘুমের সময় পরিবর্তন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি দেখা দিতে পারে।
তাই ছুটির দিনসহ প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
কম বা বেশি ঘুমালে কি রক্তচাপ বাড়তে পারে?
শুধু কম ঘুম না, নিয়মিত অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গেও উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
অন্যদিকে, নিয়মিত ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সঙ্গেও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বেশি ঘুমালেই যে উচ্চ রক্তচাপ হবে, বিষয়টি এমন না। দীর্ঘ সময় ঘুমানোর পেছনে অন্য শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত।
ভালো ঘুমের জন্য যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন
রক্তচাপ ও হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে ঘুমের অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। যেমন-
নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যান: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন। ছুটির দিনেও এই অভ্যাস ধরে রাখুন।
দিনের বেলায় শরীরচর্চা করুন: নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম রাতে ভালো ঘুমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
ঘুমানোর আগে মানসিক চাপ কমান: অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। ঘুমানোর আগে ১০ থেকে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে পরের দিনের কাজের পরিকল্পনা লিখে রাখতে পারেন।
ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক রাখুন: ঘুমানোর আগে ঘরের আলো কমিয়ে দিন। মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার কমিয়ে দিন। ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার ও নিরিবিলি রাখার চেষ্টা করুন।
রাতে ভারী খাবার ও ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন: ঘুমানোর ঠিক আগে অতিরিক্ত ভারী খাবার খেলে অস্বস্তি হতে পারে। পাশাপাশি চা, কফি ও অ্যালকোহলও ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ঘুমের পাশাপাশি আর কী করবেন?
শুধু নিয়মিত ঘুমালেই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এর জন্য জীবনযাপনের অন্যান্য অভ্যাসেও পরিবর্তন আনা জরুরি।
• খাবারে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার কমাতে হবে।
• প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল ও শস্য রাখতে হবে।
• কলা, আলু, অ্যাভোকাডো ও ডালের মতো পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার খেতে পারেন। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে পটাশিয়াম গ্রহণের পরিমাণ নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
• সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের চেষ্টা করুন।
• নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিজের দৈনন্দিন রুটিন অনুযায়ী ঘুমের সময় ঠিক করুন। প্রতিদিন ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম ও রক্তচাপ মাপার অভ্যাস গড়ে তুলুন। শারীরিক জটিলতা থাকলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
তথ্যসূত্র: Eating well