ত্বকের রং কালচে বা গাঢ় হয়ে যাওয়াকে অনেকেই অতিরিক্ত রোদে পোড়া, প্রসাধনীর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বয়সজনিত পরিবর্তন বলে মনে করেন। তবে সব সময় তা নাও হতে পারে। শরীরে অ্যাডিসন রোগের মতো গুরুতর সমস্যার কারণেও ত্বকের রং পরিবর্তন হতে পারে।

কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসলসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি হয়। এই গ্রন্থি পর্যাপ্ত কর্টিসল উৎপাদন করতে না পারলে অ্যাডিসন রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এতে ত্বকের রং ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে যায়। তবে গোটা শরীর কালো হয় না; বরং নির্দিষ্ট স্থানে বিশেষ ধরনের কালচে পরিবর্তন দেখা যায়।

ঘাড়, বগল বা কুঁচকির মতো ভাঁজের জায়গায় ত্বক কালো হয়ে গেলে তাকে অ্যাকান্থোসিস নাইগ্রিকানস বলে। এর প্রধান কারণ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। অর্থাৎ শরীরে ইনসুলিন থাকা সত্ত্বেও তা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা, প্রি-ডায়াবেটিস, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিএমওএস) এবং কিছু হরমোনজনিত সমস্যায় এই অবস্থা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে অল্প বয়সে ঘাড় হঠাৎ কালো হতে শুরু করলে শুধু প্রসাধনী ব্যবহার নয়, রক্তে শর্করা ও বিপাকীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি।

প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে পিএমওএস একটি পরিচিত হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যা। এতে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দিতে পারে। তবে ঘাড় কালো হলেই যে পিএমওএস, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে।

শরীরে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত কর্টিসল থাকলে কুশিং সিনড্রোম হতে পারে। এতে মুখ গোল হয়ে যাওয়া, পেটে চর্বি জমা, ত্বকের পরিবর্তন ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ দীর্ঘদিন সেবন করলেও এই সমস্যা হতে পারে। এছাড়া কিছু থাইরয়েড রোগ, ভিটামিনের ঘাটতি এবং অন্যান্য হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যায়ও ত্বকের রং, আর্দ্রতা ও গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে।

ত্বক কালো হওয়ার সঙ্গে নিচের যেকোনো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—অস্বাভাবিক দুর্বলতা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দ্য বা বারবার বমি, রক্তচাপ কম থাকা বা দাঁড়ালে মাথা ঘোরা, ঘাড় বা বগল হঠাৎ বেশি কালো ও মোটা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা বা প্রস্রাব, মাসিক অনিয়মিত হওয়া, অতিরিক্ত লোম গজানো বা ব্রণ, দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ওষুধ ব্যবহার, মুখের ভেতর বা পুরোনো ক্ষতের স্থানে অস্বাভাবিক কালচে রং।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কারণ নির্ণয়। শুধু ফরসা করার ক্রিম ব্যবহার করে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অ্যাডিসন রোগ হলে প্রয়োজনীয় হরমোন প্রতিস্থাপন চিকিৎসা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকলে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ডায়াবেটিস থাকলে যথাযথ চিকিৎসা এবং পিএমওএস বা অন্যান্য হরমোনজনিত রোগ থাকলে কারণভিত্তিক চিকিৎসা প্রয়োজন। ত্বকের রঙের পরিবর্তন অনেক সময় শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি শরীরের ভেতরে চলতে থাকা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সংকেতও হতে পারে। তাই এ ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।