সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে বিছানায় যাওয়া পর্যন্ত সারাদিনই আমরা স্ক্রিনের ওপর নির্ভর করি। হোক সেটা কম্পিউটার, ডেস্কটপ বা মোবাইল ফোন। সারাদিন অফিসে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করছেন। বাসায় ফিরে শুয়ে শুয়ে রিলস দেখা, ছুটির দিনে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফাস্টফুড খাওয়া; সব মিলিয়ে আমাদের জীবন এখন অনেক বেশি যান্ত্রিক হয়ে গেছে।
আর এই যান্ত্রিক জীবনের সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে নারীদের। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শরীরের হরমোনের ওপর। যার ফলে বর্তমান সময়ে নারীদের মধ্যে খুবই পরিচিত একটি সমস্যা দেখা দিচ্ছে- ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম’ বা সংক্ষেপে পিসিওএস। সাধারণ মনে হলেও এটি কিন্তু খুবই মারাত্মক একটি সমস্যা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বর্তমানের পরিসংখ্যান নিয়ে বেশ চিন্তিত। আমাদের পাশের দেশ ভারতে প্রতি ৫ জন নারীর মধ্যে অন্তত ১ জন কমবেশি পিসিওএসের সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় একটি স্বাস্থ্য সমস্যা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়লেও বেশিরভাগ নারী প্রথমদিকে এর উপসর্গগুলো বুঝতেই পারেন না। মুড সুইং, কিছুটা ওজন বেড়ে যাওয়া কিংবা কাজের ক্লান্তি ভেবে এগুলোকে পুরোপুরি এড়িয়ে যান।
কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, শুরুতেই সঠিক চিকিৎসা নিয়ে নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন না করলে এই সমস্যা একসময় বন্ধ্যত্বের মতো জটিল রূপও নিতে পারে। ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট তৈরি হওয়াই কেবল পিসিওএস নয়। এটি পুরো শরীরের হরমোন ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিতে পারে। তাই পিসিওএস শনাক্ত করতে পারাটা খুবই জরুরি।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, শরীরের ঠিক কোন পরিবর্তনগুলোকে পিসিওএসের প্রাথমিক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করবেন-
ত্বকে অতিরিক্ত তৈলাক্ত ভাব এবং ব্রণ ওঠা
শরীরে বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেলে সিবাম গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ ত্বক অনেক বেশি তৈলাক্ত হয়ে পড়ে। আপনার যদি চোয়াল, থুতনি, গলার ওপরের অংশ, ঘাড় কিংবা পিঠে ঘন ঘন ব্রণ উঠতে শুরু করে, তবে সেটাকে কেবল স্কিনের সমস্যা ভাববেন না। হরমোনের ভারসাম্য ঠিক না থাকলে এ রকম হতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনাকে শুরুতেই সতর্ক হতে হবে।
শরীরে অপ্রয়োজনীয় লোম বেড়ে যাওয়া
পিসিওএসের প্রধান দৃশ্যমান একটি লক্ষণ হলো শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় অতিরিক্ত লোম গজানো। ঠোঁটের ওপর, চিবুক, বুক, নাভির নিচে বা উরুর অংশে যদি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি লোম গজাতে দেখেন, তবে সতর্ক হোন। এ ছাড়া চুলে খুশকির সমস্যা যদি হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, সেটাও পিসিওএসের লক্ষণ হতে পারে।
অতিরিক্ত চুল পড়া
চুল পড়া তো আজকাল খুব কমন একটি সমস্যা। তবে তা যদি হঠাৎ করে মাত্রা ছাড়িয়ে যায় এবং কপালের দুইপাশ বা মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা হতে শুরু করে, কিংবা সিঁথি আগের চেয়ে চওড়া দেখায়- তাহলে এটা আর স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে না। বুঝে নেবেন, আপনার শরীরের ভেতরের কোনো হরমোন বড় ধরনের বার্তা দিচ্ছে।
ত্বকে কালচে ও ছোপ ছোপ আস্তরণ
গলার চারপাশ, বগল কিংবা স্তনের নিচের দিকের ত্বক যদি হঠাৎ করেই মোটা, কালচে এবং ছোপ ছোপ ভেলভেটের মতো হতে শুরু করে, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘অ্যাকানথোসিস নিগ্রিক্যানস’ বলা হয়। এই লক্ষণটি দেখলেই অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। এটি শরীরের হরমোনাল ইমব্যালেন্সের ইঙ্গিত দেয়।
অনিয়মিত পিরিয়ড
পিসিওএসের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো অনিয়মিত পিরিয়ড হওয়া। পিরিয়ডের তারিখ পার হয়ে দীর্ঘদিন পরে হওয়া, প্রতি মাসে অনিয়মিত হওয়া, কিংবা পিরিয়ডের সময় রক্তপাতের পরিমাণ হঠাৎ খুব কমে যাওয়া- এগুলো সবই পলিসিস্টিক ওভারির সংকেত।
পিসিওএস থেকে মুক্তির উপায় কী
পিসিওএসকে মোকাবিলা করতে হলে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই। পিসিওএস দ্রুত সারিয়ে ফেলার মতো কোনো রোগ নয়, তবে সঠিক লাইফস্টাইল ও ডায়েট মেনে চললে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। পিসিওএস মোকাবিলায় কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলতে পারেন-
ওজন কমানো এবং তা ধরে রাখা
শরীরের ওজন বেড়ে গেলে পিসিওএস আরও বেড়ে যায়। তাই সবার আগে বাড়তি ওজন কমানোর দিকে নজর দিন। খাবার তালিকা থেকে অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং জাংক ফুড একেবারেই বাদ দিন। এর পরিবর্তে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি, ফল (যেমন পেয়ারা, ডালিম, আপেল) এবং চর্বিহীন প্রোটিন যেমন- ডিম, মাছ ও মুরগির মাংস রাখুন। ওজন একবার কমালেই হবে না, বরং সবসময়ই নিয়ন্ত্রিত ওজনের মধ্যে থাকতে হবে।
মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকুন
মানসিক চাপমুক্ত থাকতে বললেই আসলে থাকা যায় না। বলা সহজ হলেও জীবনে তা বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। তবুও মানসিক শান্তি বজায় রাখতে নিয়মিত মেডিটেশন, ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজ বা নিজের পছন্দের কোনো ক্রিয়েটিভ কাজে মন দিন। রাতে গভীর ও পর্যাপ্ত ঘুম হরমোন ব্যালেন্স করতে বেশ ভালো কাজ করে। সবসময় ইতিবাচক চিন্তাভাবনা করুন।
নিয়মিত শরীরচর্চা বা এক্সারসাইজ
কায়িক পরিশ্রমহীন জীবন পিসিওএসের অন্যতম বড় কারণ। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা হাঁটুন, ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন বা জিম করুন। শরীর থেকে ঘাম ঝরালে হরমোনের কার্যকারিতা স্বাভাবিক থাকে।
এখন থেকে শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখুন। মুড সুইং বা ওজন বাড়াকে পিসিওএসের একমাত্র লক্ষণ না ভেবে শরীরের সিগন্যালগুলোর দিকে নজর দিন। ছোটখাটো এই পরিবর্তনগুলোকে আর ফেলনা ভাববেন না। একটু সচেতনতা আর সঠিক জীবনযাত্রাই আপনাকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পারে।
সূত্র: নিউজ ১৮ বাংলা