একটি নবজাতক শিশুর পুষ্টির জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। তবে বিভিন্ন কারণে যদি কোনো শিশু তার জন্মদাত্রী মায়ের দুধ না পায়, তবে তার পুষ্টির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে অন্য একজন দাতা মায়ের দুধ খাওয়ানোর কথা ভাবা হয়। তবে প্রশ্ন জাগে, যেকোনো মা কি চাইলেই অন্য কোনো শিশুকে দুধ খাওয়াতে পারেন?

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক মৃত মায়ের সন্তানের জন্য ‘দুধ-মা’ খোঁজার বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মায়ের মৃত্যু হলে সেই অসহায় শিশুর পুষ্টির দায়িত্ব কে নেবে, তা একটি বড় প্রশ্ন। জন্মের পর থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে মায়ের দুধের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে প্রথম ছয় মাস শিশুর সম্পূর্ণ পুষ্টির একমাত্র উৎস হলো মায়ের দুধ। যেসব শিশু অপরিণত অবস্থায় জন্মায়, তাদের জন্য মাতৃদুগ্ধ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাজারের ফর্মুলা দুধের তুলনায় অন্য মায়ের দুধ অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর। বিশ্বের কিছু দেশে মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক বা মিল্ক ব্যাংক রয়েছে, যেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।

এই বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট ডা. আনিকা তাবাস্‌সুমের মতামত নেওয়া হলে তিনি জানান, উদ্যোগটি মহৎ হলেও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কারণে অন্য মায়ের দুধের ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে, ওই মায়ের নিজের সন্তান যেন পর্যাপ্ত দুধ থেকে বঞ্চিত না হয়।”

অন্যের সন্তানকে দুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে দাতা মায়ের শরীরে কিছু সংক্রামক রোগের উপস্থিতি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিচের বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে:

প্রথমত, এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, হেপাটাইটিস সি ভাইরাস, হিউম্যান টি-সেল লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস এবং সিফিলিসের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। যেহেতু সিফিলিসের উপসর্গ সব সময় প্রকাশ পায় না, তাই দুধ দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, হারপেস সিমপ্লেক্স ভাইরাস সংক্রমণ থাকলে স্তনে জ্বর ঠোসার মতো ক্ষত হতে পারে। তবে যদি একটি স্তনে সংক্রমণ না থাকে, তবে সেখান থেকে দুধ নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এছাড়া ব্রুসেলা সংক্রমণ, যার সাধারণ উপসর্গ হিসেবে জ্বর ও ব্যথা দেখা দেয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি মাঙ্কি ভাইরাস এবং ইবোলা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির আরও কিছু দিক রয়েছে। স্তন্যদানকারী মা যদি ধূমপান বা তামাকজাত পণ্য সেবন করেন, তবে তা শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনকারী মায়ের দুধও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া কোনো রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ গ্রহণ করলে তা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই অন্যের সন্তানকে দুধ দেওয়ার আগে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে চিকিৎসক নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষা করতে দিতে পারেন। দাতা মা যদি কোনো ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগে আক্রান্ত থাকেন, তবে কত দিন পর তিনি অন্যের সন্তানকে দুধ দিতে পারবেন কিংবা আদতে পারবেন কি না, সেটি চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন।

স্তন্যদানকারী মায়েদের ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ থাকে। তাই সম্প্রতি তিনি কী কী ওষুধ গ্রহণ করেছেন, তা চিকিৎসককে জানাতে হবে। পাশাপাশি কোনো সাপ্লিমেন্ট বা হারবাল ওষুধ সেবন করলেও তা জানানো প্রয়োজন।

পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে ডা. আনিকা তাবাস্‌সুম জানান, মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের দুধ পাস্তুরাইজেশন করা থাকে, কিন্তু আমাদের দেশে তেমন সুযোগ নেই। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে হবে। প্রতিবার দুধ সংগ্রহের আগে হাত এবং দুধ সংগ্রহের অনুষঙ্গটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে এবং দুধ সংরক্ষণ করতে হবে পরিষ্কার পাত্রে।

দুধ সংরক্ষণের নিয়মাবলী সম্পর্কে তিনি জানান, দুধ সংগ্রহের পর কক্ষ তাপমাত্রায় (২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম) চার ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো থাকে। তবে বোতল থেকে শিশুকে খাওয়ানো হলে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সেটি ব্যবহার করা যাবে। ফ্রিজের সাধারণ চেম্বারে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কম তাপমাত্রায় রাখলে চার দিন পর্যন্ত এবং ডিপ ফ্রিজে মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার কমে রাখলে ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ব্যবহারোপযোগী থাকতে পারে।

সতর্ক করা হয়েছে যে, চুলায় বা ওভেনে মায়ের দুধ গরম করা যাবে না। একটি পাত্রে ঈষদুষ্ণ পানি নিয়ে তাতে দুধের বোতল রাখলে দুধ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসবে। তাই ফ্রিজ বা ডিপ ফ্রিজে রাখতে হলে দুধের বোতলটি মানসম্মত হতে হবে, যা তাপে নষ্ট হবে না।

ডিপ ফ্রিজে রাখা দুধ ফ্রিজে রেখেও গলানো যায়। তবে এভাবে দুধ সম্পূর্ণ গলানোর পর তা ফ্রিজে চব্বিশ ঘণ্টার বেশি রাখা যাবে না এবং পুনরায় ডিপ ফ্রিজেও রাখা যাবে না। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনার পর সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সেই দুধ শিশুকে খাওয়ানো যাবে। পরিশেষে, অপরিণত নবজাতকের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বিশেষ কোনো নির্দেশনা দিলে তা অবশ্যই যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।