সারাদিন কম্পিউটার বা মোবাইলের পর্দায় তাকিয়ে কাজ করলে চোখ সাভাবিকভাবেই ক্লান্ত হয়ে আসে। আবার দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটাচলা বা কাজের ব্যস্ততায় পায়েও ব্যথা ও অস্বস্তি হতে পারে। এসব সমস্যা থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে বর্তমানে অনেকেই চোখ ও পায়ের ম্যাসাজার ব্যবহার করছেন। ম্যাসাজার কোনো কোনো যন্ত্রে থাকে হালকা গরম বাতাস বা তাপ, কোনোটি চোখের চারপাশে চাপ দেয়। পায়ের ম্যাসাজারে আবার থাকে কম্পন, রোলার বা মালিশের ব্যবস্থাও।
এসব যন্ত্র সাময়িক ব্যবহারে আরাম মিলতে পারে। কিন্তু চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো, চোখের রোগ সারানো বা পায়ের রক্ত চলাচলের সমস্যা দূর করার মতো দাবি কতটা সত্য? আর কারা এসব ম্যাসাজার ব্যবহারে সতর্ক থাকবেন- তা জানাটা বেশি জরুরি।
ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানান, চোখ ও পায়ের ম্যাসাজার কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এগুলো কোনো চিকিৎসার বিকল্প না। বিশেষ করে চোখের রোগ, ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ুর সমস্যা বা রক্ত চলাচলের জটিলতা থাকলে এসব যন্ত্র ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
চোখের ম্যাসাজার কি সত্যিই উপকারী?
চোখের ম্যাসাজার সাধারণত হালকা তাপ, কম্পন বা চোখের চারপাশে মৃদু চাপ প্রয়োগ করে থাকে। দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের পর এটি কারও কারও কাছে বেশ আরামদায়ক মনে হতে পারে। চোখের চারপাশের টানটান ভাব কমে সাময়িক স্বস্তিও মিলতে পারে এর মাধ্যেমে।
তবে চোখের ক্লান্তির কারণ সব সময় একই থাকে না। দীর্ঘ সময় কাছের কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকা, কম পলক ফেলা, চোখের শুষ্কতা, পর্দার আলো বা চশমায় সঠিক পাওয়ার না থাকলেও চোখে অস্বস্তি হতে পারে।
তাই চোখের ম্যাসাজার ব্যবহার করলেই চোখের ক্লান্তির মূল কারণ দূর হবে, বিষয়টা এমন না। এসব যন্ত্র দৃষ্টিশক্তি বাড়ায়, চোখের রোগ প্রতিরোধ করে অথবা চোখের নিচের কালচে দাগ ও ফোলাভাব স্থায়ীভাবে দূর করে দেয়, এমন দাবির পক্ষে আসলে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
চোখের শুষ্কতা বা চোখের পাতার কিছু সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উষ্ণ সেঁক উপকারী হতে পারে। কিন্তু ঘরে ব্যবহারের সব বৈদ্যুতিক চোখের ম্যাসাজারের কার্যকারিতা এক রকম না। মূলত যন্ত্রের তাপমাত্রা, চাপ ও নকশার ওপর এর নিরাপত্তা নির্ভর করে।
চোখের ম্যাসাজার ব্যবহারে কারা সতর্ক থাকবেন?
সবার আগে বোঝা দরকার, চোখের আশপাশের অংশ খুবই সংবেদনশীল। তাই অতিরিক্ত চাপ বা তাপ প্রয়োগ করলে অস্বস্তি বা অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব যন্ত্র সরাসরি চোখের বলের ওপর চাপ দেয়, সেগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকা জরুরি।
নিচের সমস্যাগুলো থাকলে চোখের ম্যাসাজার ব্যবহারের আগে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন-
গ্লুকোমা বা চোখের চাপজনিত রোগ
রেটিনার সমস্যা
সম্প্রতি চোখের অস্ত্রোপচার
চোখের দীর্ঘস্থায়ী বা গুরুতর শুষ্কতা
চোখের অন্য কোনো নির্ণীত রোগ
ম্যাসাজার ব্যবহারের পর চোখে ব্যথা, লালচে ভাব, ঝাপসা দেখা বা অস্বস্তি বেড়ে গেলে অবশ্যই ব্যবহার বন্ধ করুন। দৃষ্টিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন বা তীব্র চোখের ব্যথা হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নিন।
পায়ের ম্যাসাজার কি ক্লান্তি ও ব্যথা কমায়?
পায়ের ম্যাসাজারে সাধারণত রোলার, কম্পন, মালিশ বা তাপের ব্যবস্থা থাকে। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা, হাঁটাচলা অথবা শারীরিক পরিশ্রমের পর এসব যন্ত্র পায়ের পেশিতে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হালকা মালিশে পেশির টানটান ভাব কমে এবং আরাম অনুভূত হয়। দিনের শেষে ক্লান্ত পায়ে কিছুটা স্বস্তি পেতেও এটি সহায়ক হতে পারে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, পায়ের ব্যথার কারণ অনেক রকম হয়ে তাকে। পেশিতে টান, জুতার সমস্যা, বাত, স্নায়ুর অসুবিধা বা রক্তনালির রোগের কারণেও পায়ে ব্যথা হতে পারে। তাই ম্যাসাজারে সাময়িক আরাম পেলেই সমস্যার মূল কারণ দূর হয়েছে, এমনটা ভাবা ঠিক না।
বিশেষ করে পায়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথা, অকারণে ফোলাভাব, জ্বালাপোড়া, ঝিনঝিন করা বা অসাড়তা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের ম্যাসাজার ব্যবহারে ঝুঁকি থাকে
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পায়ের ম্যাসাজার ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন আছে। দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে তাপ, ব্যথা বা চাপের অনুভূতি কমে যেতে পারে সাভাবিকভাবেই।
এ অবস্থায় ম্যাসাজার অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে বা বেশি চাপ প্রয়োগ করলেও ব্যবহারকারী তা বুঝতে পারেন না। এতে ত্বকে পোড়া ক্ষত, ফোসকা বা অন্য আঘাত হতে পারে। পায়ের রক্ত চলাচল খারাপ থাকলে ক্ষত শুকাতেও বেশি সময় লাগতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ুর ক্ষতির কারণে পায়ে কাটা, ফোসকা বা ক্ষত তৈরি হলেও অনেকে তা বুঝতে পারেন না। তাই ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য পায়ের যত্ন নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস থাকলে, বিশেষ করে পায়ের অনুভূতি কমে গেলে বা রক্ত চলাচলে সমস্যা থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গরম হয় এমন বা জোরে চাপ প্রয়োগকারী ম্যাসাজার ব্যবহার না করাই ভালো। পায়ে কোনো ক্ষত, ফোসকা বা সংক্রমণ থাকলেও এ ধরনের ম্যাসাজার এড়িয়ে চলুন।
পা ফুলে গেলে বা রক্ত চলাচলে সমস্যা থাকলে কী করবেন?
অনেক পায়ের ম্যাসাজারের বিজ্ঞাপনে রক্ত চলাচল বাড়ানোর কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সাময়িক আরাম পাওয়া আর রক্তনালির রোগের চিকিৎসা - এ দুটি বিষয় এক না। ম্যাসাজার দিয়ে রক্ত চলাচলজনিত সব সমস্যা দূর করা যায়, এমন নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ নেই।
পা ফুলে যাওয়ার পেছনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা ছাড়াও হৃদ্যন্ত্র, কিডনি, শিরা অথবা অন্য শারীরিক সমস্যার ভূমিকা থাকতে পারে। তাই পা নিয়মিত ফুলে গেলে শুধু ম্যাসাজার ব্যবহার না করে কারণ নির্ণয় করা এক্ষেত্রে জরুরি।
বিশেষ করে একটি পা হঠাৎ ফুলে গেলে এবং সঙ্গে ব্যথা, লালচে ভাব বা অস্বাভাবিক গরম অনুভূতি থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। এগুলো গভীর শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় চিকিৎসকের মূল্যায়নের আগে আক্রান্ত স্থানে ম্যাসাজও করবেন না।
চোখ ও পায়ের ম্যাসাজার ব্যবহারের সময় যেসব বিষয় মনে রাখবেন
ম্যাসাজার ব্যবহারে কিছু সাধারণ সতর্কতা মেনে চলা উচিত।
কম চাপ দিয়ে শুরু করুন: প্রথমবার ব্যবহার করলে সবচেয়ে কম তীব্রতার সেটিং বেছে নিন। ব্যথা বা অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন: গরম হয় এমন যন্ত্র ব্যবহারের সময় নির্দেশিকা অনুসরণ করুন। বিশেষ করে পায়ের অনুভূতি কম থাকলে তাপের কারণে ক্ষতি হতে পারে।
চোখের ওপর চাপ দেবেন না: চোখের বলের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে, এমন যন্ত্র এড়িয়ে চলুন। চোখের রোগ থাকলে আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ক্ষতস্থানে ব্যবহার করবেন না: পায়ে কাটা, ফোসকা, ত্বকের সংক্রমণ বা সাম্প্রতিক আঘাত থাকলে আক্রান্ত স্থানে ম্যাসাজার ব্যবহার করবেন না।
দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাকে অবহেলা করবেন না: চোখে অস্বস্তি, পায়ে ব্যথা বা ফোলাভাব বারবার হলে শুধু ম্যাসাজারের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নির্দেশিকা মেনে চলুন: যন্ত্রের নির্ধারিত ব্যবহারের সময় ও পরিচ্ছন্নতার নিয়ম অনুসরণ করুন। ব্যবহারের সময় ঘুমিয়ে পড়বেন না, বিশেষ করে তাপযুক্ত যন্ত্রের ক্ষেত্রে।
চোখ ও পায়ের আরাম পেতে আর কী করতে পারেন
চোখের ক্লান্তি কমাতে দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে না থেকে নিয়মিত বিরতি নিন। মাঝেমধ্যে দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকান, সচেতনভাবে পলক ফেলুন এবং পর্দার উজ্জ্বলতা ও বসার অবস্থান ঠিক রাখুন। চোখে শুষ্কতা বা ঝাপসা দেখার সমস্যা নিয়মিত হলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
পায়ের ক্লান্তি কমাতে আরামদায়ক জুতা পরুন, দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকলে বিরতি নিন এবং সহনীয় মাত্রায় হাঁটাচলা করুন। তবে ব্যথা বা ফোলাভাবের কারণ অজানা থাকলে নিজে থেকে জোরে মালিশ করা উচিত নয়।
চোখ ও পায়ের ম্যাসাজার দৈনন্দিন ক্লান্তি থেকে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এসব যন্ত্র দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর, চোখের রোগ সারানোর কিংবা রক্ত চলাচলের জটিলতা দূর করার নিশ্চিত উপায় নয়।
বিশেষ করে গ্লুকোমা, রেটিনার সমস্যা, সাম্প্রতিক চোখের অস্ত্রোপচার, ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ুর ক্ষতি বা পায়ের রক্ত চলাচলের সমস্যা থাকলে ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর চোখে তীব্র ব্যথা, দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন কিংবা পা হঠাৎ ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ম্যাসাজার ব্যবহার না করে চিকিৎসা নিন।
সূত্র: ভারতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির ‘Eye And Foot Massagers: Health Benefits, Risks And What You Need To Know?’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।