ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে শরীরের বিপাকীয় ভারসাম্য, স্থূলতা, ইনসুলিন অকার্যকারিতা, ডায়াবেটিস ও রক্তের চর্বির অস্বাভাবিকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই রোগটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, যা দূর করা প্রয়োজন।

অনেকে মনে করেন ফ্যাটি লিভার কেবল অ্যালকোহল পানের কারণে হয়। তবে এ ধারণা ভুল। অ্যালকোহলের সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক নেই। এ জন্যই এর আরেক নাম ছিল নন–অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ। বরং এর সঙ্গে ওজনাধিক্য, রক্তে শর্করা ও চর্বির আধিক্য এবং মেদ–ভুঁড়ির সম্পর্ক রয়েছে।

আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো, লিভার ফাংশন টেস্ট বা এসজিপিটি স্বাভাবিক থাকলে ফ্যাটি লিভার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। এ ধারণাও ভুল। কারণ, ৮০ শতাংশ ফ্যাটি লিভার আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে এসজিপিটি বা লিভার ফাংশন টেস্ট স্বাভাবিক থাকতে পারে। লিভারে অনেকখানি প্রদাহ হলে তবেই এসজিপিটি বাড়তে শুরু করে, তার আগে নয়। তবে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এসজিপিটি বাড়ার অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে পারে।

অনেকে মনে করেন নির্দিষ্ট কিছু সুপারফুড বা সাপ্লিমেন্ট এই রোগ নিরাময় করতে পারে। এ ধরনের ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে অনেকে ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট, গ্রিন টি–সহ নানা ধরনের সুপারফুড গ্রহণ করে থাকেন। এর কোনোটারই উপকারিতা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত নয়।

সাধারণত মনে করা হয় কেবল স্থূল ব্যক্তিরাই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত হন। এ ধারণাও ভুল। যদিও ওজনাধিক্য ও স্থূলতা ফ্যাটি লিভারের অন্যতম কারণ, তারপরও একটি বড় অংশের ওজন স্বাভাবিক থাকতে পারে। শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, রক্তে চর্বির পরিমাণ ও দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গে চর্বির (ভিসেরাল ফ্যাট) পরিমাণের ওপর এটি নির্ভর করে।

ফ্যাটি লিভার কেবল বয়স্কদের রোগ—এমন ধারণা এখন আর সঠিক নয়। বর্তমানে শিশু–কিশোরদের মধ্যেও ফ্যাটি লিভার আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। শৈশবে ওজন বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, কায়িক শ্রমহীনতা ও মন্দ খাদ্যাভ্যাস শিশু–কিশোরদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

খাদ্যাভ্যাস নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে যে সব ধরনের শর্করা বা চর্বিজাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে কি না। শর্করা বা চর্বিজাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। গুরুত্বপূর্ণ হলো কোন ধরনের শর্করা বা চর্বি গ্রহণ করছেন তা বাছাই। সহজ শর্করা যেমন চিনি, সাদা ময়দা বা চালের তৈরি খাবার বাদ দিয়ে জটিল শর্করা যেমন লাল চাল, লাল আটা, ওটস, আঁশযুক্ত শর্করা খেতে হবে। ভালো চর্বি মানে পলিআনস্যাচুরেটেড ও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করতে হবে। ভালো চর্বি বরং লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। ট্রান্সফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট এড়িয়ে চলতে হবে।

দুগ্ধজাত খাবার ও ডিম নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করে বলা যায়, ল্যাকটোজ সংবেদনশীলতা না থাকলে দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খেতে নিষেধ নেই। তবে দুধের সর, মাখন, ঘি ইত্যাদি এড়িয়ে যেতে হবে। ডিমে আমিষ ও গুড ফ্যাট থাকে, তাই ডিমও নিষেধ নয়।

সবশেষে কফি পানের বিষয়ে বলা যায়, ফ্যাটি লিভারে কফি পানে কোনো সমস্যা নেই। বরং গবেষণা বলছে, দিনে ২-৩ কাপ কফি লিভারের জন্য স্বাস্থ্যকর। তবে কফির সঙ্গে চিনি বা ক্রিম খাওয়া যাবে না।

তথ্যসূত্র: ডা. নাজমা আক্তার, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি ও মেটাবলিজম বিভাগ, মার্কস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।