চীনের শেনঝেন শহরের একটি কারখানায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে কাজ শুরু করেছিলেন ঝোউ ছুনফেই। তিন দশকের বেশি সময় পরে তাঁর প্রতিষ্ঠান লেন্স টেকনোলজি এখন অ্যাপল ও টেসলার মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সরবরাহকারী। তাঁর এই উত্থান অনেকটা রূপকথার মতোই।

সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় ভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানে টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে বসেছিলেন ঝোউ। ছবিটি শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রতীক নয়; বরং এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থায় লেন্স টেকনোলজির গুরুত্ব এখন অনেক বড়।

ঝোউ হুনান প্রদেশের একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দক্ষিণ চীনের শেনঝেনে চলে যান এবং সেখানে একটি কারখানায় কাচ তৈরির কাজ শেখেন। চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় লাখ লাখ অভ্যন্তরীণ শ্রমিকের মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তাঁকে। তবে অন্যদের থেকে আলাদা ছিল তাঁর উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে গভীর আগ্রহ। ১৯৯৩ সালে তিনি নিজের ব্যবসা শুরু করেন।

শুরুতে তাঁর কারখানায় ঘড়ির কাচে নকশা ও লেখা ছাপার কাজ হতো। ছোট হলেও ব্যবসাটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ঝোউ তখনই বুঝতে পেরেছিলেন, ইলেকট্রনিক পণ্য যত ছোট ও হালকা হবে, সেগুলো তৈরিতে সূক্ষ্ম ও উন্নত প্রযুক্তির গুরুত্ব তত বাড়বে। সেই ধারণা থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে তাঁর প্রতিষ্ঠান। একসময় বড় ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতাদের জন্য প্রয়োজনীয় কাচ ও টাচস্ক্রিন-সংশ্লিষ্ট উপাদান তৈরি শুরু করে লেন্স।

২০১৫ সালে লেন্স টেকনোলজি শেনঝেনের চাইনেক্সট বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। এরপর ঝোউ চীনের অন্যতম ধনী আত্মপ্রতিষ্ঠিত নারী উদ্যোক্তা হয়ে ওঠেন। তাঁর সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়; অর্থ, আবাসন বা ইন্টারনেট ব্যবসার ওপর ভর করেও তিনি বড় হননি। উৎপাদন খাতের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে তিনি নতুন ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।

স্মার্টফোনের বাইরেও পা দিয়েছে লেন্স। এখন এআই হার্ডওয়্যারের দৌড়ে প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ। স্মার্ট গাড়ি, এআই চশমা, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, গাড়ির ককপিট ও বিভিন্ন উন্নত যন্ত্রাংশ তৈরি করছে তারা। এ ছাড়া মহাকাশপ্রযুক্তি ও মানুষের মতো দেখতে রোবট তৈরিতেও লেন্সের নাম জড়িয়ে গেছে।

ইলন মাস্কের জন্য এমন অংশীদার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠান নতুন প্রযুক্তিপণ্য দ্রুত ও বড় পরিসরে তৈরি করতে পারে, তাদের কদর আছে। বিশেষ করে টেসলা, অপটিমাস রোবট ও স্পেসএক্সের মতো প্রকল্পে এমন সরবরাহকারী দরকার। কাচ ও ধাতু প্রক্রিয়াজাত করা, বিভিন্ন উপাদান জোড়া লাগানো ও নিখুঁত কাঠামোগত যন্ত্রাংশ তৈরিতে লেন্সের অভিজ্ঞতা মাস্কের এসব প্রকল্পের সঙ্গে ভালোভাবে মিলে যায়। লেন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, উত্তর আমেরিকার তাদের বড় গ্রাহক আছে। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ওই গ্রাহক হলো টেসলা।

অনেক বছর ধরে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে চীন ছিল কম খরচে পণ্য তৈরির অংশীদার। এখন সে ধারণা বদলাচ্ছে। লেন্স নিজেকে এআই হার্ডওয়্যারের যুগের জন্য এমন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে, যেখানে এক জায়গা থেকেই বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ তৈরি হবে। প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপ শুধু পণ্য জোড়া লাগানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; উন্নত স্মার্টফোন, গাড়ি, চশমা বা রোবট তৈরিতে পুরো উৎপাদনপ্রক্রিয়া একসঙ্গে সামলাতে পারে—এমন দক্ষ শিল্পব্যবস্থা দরকার হবে।

লেন্স সে পথেই এগোচ্ছে। স্মার্টফোন ও কম্পিউটার এখনো তাদের আয়ের বড় উৎস। পাশাপাশি স্মার্ট গাড়ি, পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, এআই চশমা ও মহাকাশ-সংশ্লিষ্ট পণ্য তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। অতি পাতলা সৌর প্যানেলের কাচ ও মহাকাশে ব্যবহার উপযোগী নমনীয় কাচ নিয়েও কাজ করছে তারা। অর্থাৎ শুধু ভোক্তা ইলেকট্রনিকস নয়, ভবিষ্যতে অধিক মূল্য সংযোজনকারী শিল্পেও জায়গা করে নিতে চাইছে লেন্স।

চীনের শিল্পনীতিতেও এ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। শুধু বিপুল পরিমাণ পণ্য তৈরি নয়, বরং উন্নত প্রকৌশল, এআই, রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও মহাকাশপ্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো। লেন্সের পরিবর্তনও সেই বৃহত্তর প্রবণতার উদাহরণ।

তবে এ পরিবর্তনের পথ বন্ধুর। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে লেন্সের আয় কমেছে এবং প্রতিষ্ঠানটি নিট লোকসানের মুখে পড়েছে। এর পেছনে স্মার্টফোনের চাহিদা কমে যাওয়া ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের চাপ ছিল বড় কারণ। স্মার্টফোনের বাজার এখন অনেকটাই পরিণত; আগের মতো দ্রুত বাড়ছে না। ফলে ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা বৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র খুঁজতে হচ্ছে। এআই হার্ডওয়্যার ও স্মার্ট গাড়ি হতে পারে সেই নতুন সম্ভাবনার জায়গা, তবে এ দুই খাতেই প্রতিযোগিতা তীব্র এবং বিনিয়োগের প্রয়োজন অনেক বেশি।

ঝোউ ছুনফেইকে নিয়ে আগ্রহ শুধু তাঁর সম্পদ কিংবা রাষ্ট্রীয় ভোজে টিম কুক ও ইলন মাস্কের মাঝখানে বসার কারণে নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে সাফল্য ও প্রভাব কোথা থেকে আসে, তাঁর গল্প সেই প্রচলিত ধারণাও কিছুটা বদলে দেয়। গত কয়েক বছরে প্রযুক্তির গল্পে সফটওয়্যার উদ্যোক্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা এআইয়ের অ্যালগরিদম বেশি আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতি এখনো বাস্তব উৎপাদনের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। আধুনিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগুলোর জন্য কাচ, সেন্সর, বিভিন্ন কাঠামোগত উপাদান ও সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশ কাউকে না কাউকে তৈরি করতে হয়।

চীনের শিল্পায়নের সময় শেনঝেনের কারখানায় লাখ লাখ মানুষ কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে খুব কম মানুষই বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারে—এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পেরেছেন। ঝোউ তাঁদের একজন। তিনি সফল হয়েছেন, কারণ স্মার্টফোনের বাজার বিকশিত হওয়ার আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভবিষ্যতের প্রযুক্তিপণ্যে যন্ত্রাংশের মান অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তিপণ্য যত উন্নত হবে, সেগুলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও উৎপাদনপ্রক্রিয়াও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—ঝোউ ছুনফেইয়ের সাফল্য মূলত সেই উপলব্ধির গল্প।