গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা উঠলে সাধারণত কিছু নির্দিষ্ট কারণ সামনে আসে—যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে দামের উল্লম্ফন, ডলারের তীব্র সংকট, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় অথবা সরবরাহের নানা জটিলতা। এই যুক্তিগুলোর সাথে দ্বিমত পোষণ করা বেশ কঠিন। কারণ, এসব প্রক্রিয়ার অধিকাংশ আমাদের দৃষ্টির আড়ালে ঘটে এবং অদৃশ্যের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে উত্তরগুলোও সাধারণত আড়াল থেকেই আসে।

তবে আমার বিশ্বাস, গ্যাসের দাম বাড়ার পেছনে এমন কিছু কারণ রয়েছে যা এখন পর্যন্ত অর্থনীতিবিদদের কোনো গবেষণায় উঠে আসেনি। গভীর চিন্তাভাবনার পর আমি গ্যাসের দাম বাড়ার পাঁচটি অব্যর্থ কারণ খুঁজে পেয়েছি। এই কারণগুলো এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, এখনই তা প্রকাশ না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তাই একে একে তুলে ধরছি গ্যাসের দাম বাড়ার পঞ্চহেতু।

গ্যাসের দাম বাড়ার প্রথম হেতু: রান্নার বইয়ের ষড়যন্ত্র

গ্যাসের দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে রান্নার বইগুলো! বর্তমান সময়ে রান্নার বইতে নিত্যনতুন রেসিপি যুক্ত হচ্ছে। একেক বইয়ে একেক ধরনের রান্নার কথা বলা হয় এবং একেক পদের জন্য একেক রকম আয়োজন করতে হয়। এর ফলে রান্নাঘরে গ্যাসের ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা গ্যাসের চাহিদার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। সিলিন্ডার কোম্পানিগুলো এই বিপুল চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। আর সিন্ডিকেটের ভাষায়, যখন পণ্যের চাহিদা বাড়ে এবং সরবরাহ কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যায়। আর এভাবেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

দ্বিতীয় হেতু: সিলিন্ডারের আত্মসম্মানের সংকট

গ্যাস সিলিন্ডারের গায়ে বড় করে লেখা থাকে ১২ কেজি। এই নির্দিষ্ট লেখাটি দেখে গ্যাস সিলিন্ডারের মন খুব খারাপ হয়েছে। সিলিন্ডারের প্রশ্ন হলো, মানুষ কি তাকে কেবল ওজন দিয়েই বিচার করবে? তার সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব, আভিজাত্য কিংবা সামাজিক অবস্থানের কি কোনো মূল্য নেই? দীর্ঘ সময় ধরে সে মানুষের রান্নাঘরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, অথচ তার পরিচয় কেবল ১২ কেজি! এই বিষয়টি নিয়ে সিলিন্ডার মহলে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত সিলিন্ডারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, ওজনের ভিত্তিতে আর তার দাম নির্ধারণ করা যাবে না। এখন থেকে দাম নির্ধারণ করতে হবে ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে। আর ঠিক এই কারণেই গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে।

তৃতীয় হেতু: সিলিন্ডারের ভেতরে জায়গার সংকট

একটা সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারে পূর্ণ ১২ কেজি গ্যাস থাকত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সিলিন্ডারের ভেতরে গ্যাসের পাশাপাশি এখন ঢুকে পড়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয়, ডলারের সংকট এবং ব্যবসায়ীদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। এত সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভেতরে জায়গা করে নেওয়ার পর গ্যাসের জন্য খুব সামান্য জায়গা অবশিষ্ট থাকে! ফলে সিলিন্ডারে গ্যাসের পরিমাণ আগের চেয়ে কমে গেছে। গ্যাসের দাম আগের মতোই আছে, শুধু আগের দামে কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। সাংবাদিকেরা বিষয়টিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বলে প্রচার করছেন।

এবার কথা বলা যাক পাইপলাইনের গ্যাসের দাম বাড়ার বিষয়ে। তার পেছনেও রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ হেতু।

চতুর্থ হেতু: অটোরিকশা টেসলার জটিল কারসাজি

টেসলা একটি বিশাল কৌশল গ্রহণ করেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো গ্যাসচালিত গাড়ির মালিকদের এমন বিপদে ফেলা যাতে তারা বিরক্ত হয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেন। তখন তারা বাধ্য হয়ে টেসলায় চড়বেন। এই পরিকল্পনা সফল করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দেওয়া। গ্যাসের দাম যত বাড়বে, গ্যাসচালিত গাড়ির মালিকদের দুর্ভোগ তত বাড়বে এবং সেই সুযোগে টেসলার যাত্রীসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ, গ্যাসের দাম বাড়ানো আসলে টেসলায় চড়ানোর এক অভিনব প্রচেষ্টা মাত্র!

পঞ্চম হেতু: পুতুলের পাইপলাইনে পুতুল আটকে যাওয়া

রাস্তায় খেলার সময় এক শিশুর হাত থেকে কাপড় দিয়ে বানানো তার পুতুল কুকুরটি গ্যাসের পাইপলাইনে পড়ে গেছে। কিন্তু পুতুলটি উদ্ধারে কেউ রাজি হচ্ছে না। যারা উদ্ধারের কথা বলছে, তারা এই কাজের জন্য অবিশ্বাস্য রকমের বেশি মজুরি দাবি করছে। ফলে শিশুর পুতুল উদ্ধারের এই ব্যর্থ অভিযান শেষ পর্যন্ত দেশে তীব্র জ্বালানিসংকট সৃষ্টি করবে।

উপসংহার: আদতে গ্যাসের দাম বাড়েনি!

গ্যাসের দাম বাড়েনি, মানুষ এখনো পুরোনো দামে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে! সমস্যাটি মূলত মানুষের মানসিকতায়। মানুষ এখনো মনে করে রান্নার গ্যাস একটি সাধারণ প্রয়োজনীয় পণ্য। অথচ গ্যাস ইতিমধ্যে বিলাসপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে গেলে শুধু টাকা দিলেই হবে না। সঙ্গে জমা দিতে হবে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, আয়কর রিটার্ন এবং পারিবারিক সম্পদের বিবরণী।

প্রয়োজনে সিলিন্ডার কেনার আগে ক্রেতার আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য সাক্ষাৎকারও নেওয়া হতে পারে। তখন আর প্রশ্ন থাকবে না, “একটা সিলিন্ডারের দাম কত?” প্রশ্ন হবে, “সিলিন্ডার কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য আপনার আছে তো?”