যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়লাভের পর বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতের উন্নয়নের গতি মন্থর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই আশঙ্কার প্রভাবে গতকাল বৃহস্পতিবার মাত্র এক দিনেই মার্কিন পুঁজিবাজারের বাজার মূলধনের প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশাল দরপতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারেও।
আজ শুক্রবার লেনদেন শুরু হওয়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারের প্রধান সূচক কেওএসপিআই প্রায় ৯ শতাংশ হ্রাস পায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় দেশটির প্রধান স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন ২০ মিনিটের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এর আগে গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি খাতের প্রধান সূচক নাসডাক ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ কমে যায়। উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর এই সূচকটি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, যার তুলনায় হিসাব করলে দেখা যায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সূচকটি মোট ১০ শতাংশ কমেছে।
গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে বৃহস্পতিবারের আগ পর্যন্ত নাসডাক সূচকের এত বড় পতন আর দেখা যায়নি। কেবল নাসডাক নয়, যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারের অন্যান্য প্রধান সূচকগুলোও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ও ডাও জোনস সূচকও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর এক দিনে এই দুটি সূচকের এমন বড় পতন আর কখনো ঘটেনি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, বুধবার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সেদিন ডাও জোনস সূচক ১ হাজার ৫৬৯ পয়েন্ট বেড়েছিল এবং নাসডাক বেড়েছিল ১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। তবে সে সময় নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল পুরোপুরি সামনে আসেনি। পরবর্তীতে নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির খবর সামনে আসতেই বৃহস্পতিবার ডাও জোনস সূচক ১ হাজার ৮৩৩ পয়েন্ট কমে যায়। বুধবার প্রধান সূচকগুলো বাড়লেও সেমিকন্ডাক্টর চিপ নির্মাতা এবং এআই তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর ছিল নিম্নমুখী। এর ফলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক সূচকের ওপর পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে শেয়ারের এই ব্যাপক দরপতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে টেক্সাসের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনাহোসের জয়কে। এআই প্রযুক্তির বিকাশে যুক্তরাষ্ট্রের এই অঙ্গরাজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গুগল, মেটা, ওরাকল ও ওপেনএআইয়ের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে। তবে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনাহোসে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার সময় অঙ্গরাজ্যে সাময়িকভাবে ডেটা সেন্টার বা তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ রাখা এবং এই খাতে বিনিয়োগকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত কিছু করছাড় প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
টেক্সাসের মতো যেসব অঙ্গরাজ্যে বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করছে, সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয়ের পর এআই খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা চিপ নির্মাতা এবং তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের সরঞ্জাম সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ার ব্যাপক হারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার শেয়ারের দাম গতকাল এক দিনেই ৯ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। চিপ নির্মাতা কোম্পানিগুলোর একটি সূচক ১২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা প্রায় সাড়ে ছয় বছরের মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ পতন। এছাড়া ইলন মাস্কের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার শেয়ারের দাম কমেছে ১১ শতাংশ এবং তাঁর মহাকাশ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম কমেছে ৯ শতাংশ।
টেসলা ও স্পেসএক্সের শেয়ারের এই বড় দরপতনে কোম্পানি দুটির মালিক এবং বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ বৃহস্পতিবার এক দিনেই ৮০০ কোটি ডলার কমে যায়। এর ফলে ওই দিন শেষে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি ডলারের নিচে নেমে আসে। অথচ এক মাসেরও কম সময় আগে তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ট্রিলিয়নিয়ার বা এক লাখ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রায় ৪৫ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছিলেন ইলন মাস্ক। দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির দেওয়া সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অনুদান এটি। তবে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় ঠেকাতে পারেননি তিনি। এই পরিস্থিতিতে তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার পরপরই দেখা যায়, ইলন মাস্কের মালিকানাধীন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা ও মহাকাশযানসংশ্লিষ্ট কোম্পানি স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম কমতে শুরু করে। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের মূল্যও দ্রুত হ্রাস পায়। ফোবর্সের রিয়েল টাইম হিসাব অনুযায়ী, আজ সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময়) ইলন মাস্কের সম্পদের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে।