টেসলা এবং স্পেসএক্স কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আবারও ট্রিলিয়নিয়ারের মর্যাদা ফিরে পেয়েছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। ফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর তাঁর মোট সম্পদমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। এর আগে গত জুন মাসে প্রথমবারের মতো এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন মাস্ক, তবে পরবর্তীতে তাঁর সম্পদের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পায়। সোমবারের শেয়ারমূল্যের এই উল্লম্ফনের ফলে তিনি পুনরায় বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গত শুক্রবার ছিল সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস। এরপর সোমবার বাজার খোলার পর মাত্র এক দিনেই তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৩০ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৬০ কোটি ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্পদের এই ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় মাস্কের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী জেফ বেজোসের মোট সম্পদের মূল্য ৩৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৩৭ হাজার ১৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, মাস্কের মোট সম্পদের তুলনায় বেজোসের সম্পদ প্রায় ৬২৮ বিলিয়ন বা ৬২ হাজার ৮০০ কোটি ডলার কম।
জুনে প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার
গত জুনে মাস্কের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স নাসডাকে লেনদেন শুরু করার পর তিনি প্রথমবারের মতো বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হন। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় তিনি সেই বিশেষ মর্যাদাটি হারান।
সম্প্রতি এই দুই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম পুনরায় বাড়তে শুরু করায় মাস্কের সম্পদ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। গত সপ্তাহে জানা গিয়েছিল যে, বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে টেসলার গাড়ি সরবরাহের পরিমাণ বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি হয়েছে, যার ফলে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে গত শুক্রবার মাস্কের সম্পদ ৬১ বিলিয়ন বা ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলার বেড়েছিল।
ইয়াহু ফাইন্যান্সের দেওয়া তথ্যানুসারে, ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত এক সপ্তাহে নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে (ওয়ালস্ট্রিট) স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং টেসলার শেয়ারের দাম ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এরপর সোমবার সপ্তাহের শুরুতে টেসলার শেয়ারের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ৩৭৮ ডলারে পৌঁছায়। তবে স্পেসএক্সের শেয়ারের দাম আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে; গতকাল কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ৭ শতাংশের বেশি বেড়ে ১৭১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলত এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধির কারণেই মাস্ক আবারও ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদসীমা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন।
স্পেসএক্সের শেয়ারের এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। মর্গ্যান স্ট্যানলির বিশ্লেষকদের মতে, কোম্পানিটির শেয়ারের বর্তমান দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। পাশাপাশি গত সপ্তাহে স্পেসএক্সের স্টারশিপ প্রথমবারের মতো সফলভাবে কক্ষপথে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নাম বদলের প্রস্তাব
শেয়ার বাজারের উত্থানের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে মাস্ক বর্তমানে বেশ আলোচনায় রয়েছেন। গত রোববার তিনি জানিয়েছেন, স্পেসএক্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সএআইয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেসএক্সএসআই’ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবর্তে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহারের পক্ষে মত দেওয়ার পর মাস্ক সেই প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এআই খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা সাক্ষাৎ করেন। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা নিয়ে একটি নতুন অঙ্গীকারনামা প্রকাশ করা হয়। তবে ট্রাম্প মনে করেন না যে এটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক; বরং তাঁর মতে, এটি মেনে চলার ক্ষেত্রে একটি ‘নৈতিক বাধ্যবাধকতা’ থাকা উচিত।
এদিকে মাস্কের মালিকানাধীন এবং স্পেসএক্সএআই পরিচালিত চ্যাটবট গ্রোকও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মূল কোম্পানির নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গে গ্রোকের নাম উঠে এসেছে, তবে গতকাল সকাল পর্যন্ত নাম পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
মাস্ককে নিয়ে তথ্যচিত্র
চলতি মাসেই ইলন মাস্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তাঁর জীবন নিয়ে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রের কারণে। ‘মাস্ক’ নামের এই তথ্যচিত্রটি আগামী শুক্রবার নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। এরপর ১৬ অক্টোবর থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শহরে প্রদর্শিত হবে।
প্রায় চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রটি মাস্কের জীবন ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে বেশ কঠোরভাবে সমালোচনামূলক, যা প্রাথমিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। তথ্যচিত্রটির পরিচালক হলেন অ্যালেক্স গিবনি। তবে মাস্ক এই ছবিটির তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং নির্মাতার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনও আলোচনায়
ব্যক্তিগত জীবনেও সম্প্রতি বড় পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন মাস্ক। কয়েক দিন আগে তাঁর সাবেক সঙ্গী শিভন জিলিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাঁদের সম্পর্কের ইতি ঘটেছে। জিলিস মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংকের নির্বাহী হিসেবে কর্মরত। তাঁদের চার সন্তান রয়েছে।