বাড়িতে অনেক সময় একসঙ্গে বেশি রান্না হয়ে যায়। কর্মব্যস্ত দিনে আগের দিনের খাবার গরম করে খাওয়াও অনেকের অভ্যাস। ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, মাংস, নুডুলস বা পাস্তা—এসব রান্না করা খাবার ফ্রিজে রেখে দেন অনেকে। কিন্তু ফ্রিজে রাখলেই খাবার চিরকাল ভালো থাকে না। ঠান্ডা তাপমাত্রায় ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ধীর হয়, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তাই কত দ্রুত খাবার ফ্রিজে রাখা হলো, কীভাবে সংরক্ষণ করা হলো এবং কত দিন পর খাওয়া হলো—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বেশির ভাগ রান্না করা খাবারের অবশিষ্টাংশ সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন ফ্রিজে রাখা যায়।
রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ফেলে রাখা উচিত নয়। নষ্ট হতে পারে এমন খাবার রান্না বা খাওয়ার পর ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখতে হবে। পরিবেশের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে সময়টি ১ ঘণ্টা।
ফ্রিজে রাখার সময় বড় হাঁড়ি বা গভীর পাত্রে না রেখে অল্প অল্প করে অগভীর পাত্রে ভাগ করে রাখা ভালো। এতে খাবার দ্রুত ঠান্ডা হয়। পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার অপেক্ষায় খাবার বাইরে রেখে দেওয়া ঠিক নয়। ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা উচিত। কাঁচা মাংস, মুরগি ও মাছ ঢাকনাযুক্ত পাত্রে বা ভালোভাবে মোড়ানো অবস্থায় রাখুন, যাতে রস অন্য খাবারে না লাগে।
ভাত: রান্না করা ভাত নিয়ে নানা পরামর্শ প্রচলিত। কেউ কেউ বলেন এক দিনের বেশি রাখা উচিত নয়। তবে খাদ্য নিরাপত্তার সাধারণ নির্দেশনায়, ঠিকভাবে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা রান্না করা খাবার সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খাওয়া উচিত। ভাত দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে কিছু ব্যাকটেরিয়া বা তাদের তৈরি বিষাক্ত পদার্থের কারণে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভাত রান্নার পর দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা এবং দীর্ঘ সময় বাইরে না রাখাই নিরাপদ। খাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভাত বের করে ভালোভাবে গরম করুন। বারবার পুরো পাত্রের ভাত গরম ও ঠান্ডা করা এড়িয়ে চলুন।
সবজি ও তরকারি: রান্না করা সবজি, ডাল, ঝোল, স্যুপ ও বিভিন্ন ধরনের তরকারি সাধারণত ফ্রিজে ৩ থেকে ৪ দিন রাখা যায়। খাবারের ধরন, রান্নার পদ্ধতি এবং সংরক্ষণের অবস্থার ওপর মান ও নিরাপত্তা নির্ভর করে। ৪ দিনের পর পুরোনো রান্না করা খাবার খাওয়ার ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।
মাছ: কাঁচা মাছ আর রান্না করা মাছ আলাদা। কাঁচা মাছ সাধারণত ফ্রিজে ১ থেকে ২ দিন রাখা নিরাপদ। এই সময়ের মধ্যে রান্না করতে না পারলে ডিপ ফ্রিজে রাখা ভালো। রান্না করা মাছের অবশিষ্টাংশ সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন ফ্রিজে রাখা যায়। মাছের গন্ধ বা রং অস্বাভাবিক হলে শুধু গরম করে খাওয়ার চেষ্টা করবেন না। সন্দেহ হলে ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
কাঁচা মুরগি: আইস্টেমাইয়ের মূল লেখায় ৩ থেকে ৪ দিনের কথা বলা হলেও মার্কিন কৃষি বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী সময়সীমা আরও কম। কাঁচা মুরগি সাধারণত ফ্রিজে ১ থেকে ২ দিন রাখা উচিত। এরপর রান্না না করলে ডিপ ফ্রিজে সংরক্ষণ করা ভালো। রান্না করা মুরগি ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যায়। কাঁচা মুরগি রাখার সময় অবশ্যই অন্য রান্না করা খাবার ও ফলমূল-সবজি থেকে আলাদা রাখুন। কাঁচা মুরগির রস অন্য খাবারে লাগলে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কাঁচা গরু বা খাসির মাংস: সব ধরনের কাঁচা মাংসের জন্য একই সময়সীমা নয়। কিমা করা মাংস সাধারণত ফ্রিজে ১ থেকে ২ দিন রাখা উচিত। গরু, খাসি বা শূকরের বড় টুকরো, যেমন স্টেক, চপ বা রোস্ট, সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিন রাখা যায়। মাংসের প্যাকেটে ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা থাকলে সেটিও মানতে হবে। রান্না করা মাংস, ঝোল বা মাংস দিয়ে তৈরি খাবার সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়া উচিত।
ডিম: ফুল সিদ্ধ ডিম ফ্রিজে এক সপ্তাহ পর্যন্ত রাখা যায়। তবে ডিমের কারি, অমলেট বা ডিম দিয়ে তৈরি ক্যাসেরোল রান্না করা অবশিষ্ট খাবারের নিয়মে পড়বে এবং সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খাওয়া উচিত।
পাস্তা, নুডুলস বা রান্না করা শস্য: সিদ্ধ পাস্তা, বিভিন্ন ধরনের রান্না করা শস্য বা এ ধরনের খাবার দীর্ঘদিন ফ্রিজে রেখে খাওয়া ঠিক নয়। সাধারণভাবে রান্না করা খাবারের মতো এগুলোও ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়া ভালো। বেশি রান্না হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ভাগ করে কিছু অংশ ফ্রিজারে রাখা যেতে পারে। সঠিকভাবে হিমায়িত খাবার অনেক বেশি সময় নিরাপদ থাকতে পারে, যদিও দীর্ঘদিনে স্বাদ ও গুণগত মান কমে যেতে পারে।
রুটি ও পরোটা: রুটি, পরোটা বা এ ধরনের শুকনো খাবারের সংরক্ষণের সময় খাবারের ধরন ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন রাখতে চাইলে ফ্রিজার ব্যবহার করা যেতে পারে। খাবারে ছত্রাক দেখা দিলে শুধু আক্রান্ত অংশ কেটে বাকি অংশ খাওয়া নিরাপদ নয়। ছত্রাকের কিছু অংশ খাবারের ভেতরেও ছড়িয়ে যেতে পারে।
মিষ্টি ও ডেজার্ট: দুধ, ডিম বা ক্রিম দিয়ে তৈরি মিষ্টি ও ডেজার্ট সহজে নষ্ট হতে পারে। তাই এগুলো দ্রুত ফ্রিজে রাখা দরকার। ডেজার্টের ধরনভেদে সংরক্ষণের সময় আলাদা হতে পারে। দুধ বা ডিমযুক্ত ঘরোয়া ডেজার্টের ক্ষেত্রে সাধারণ রান্না করা খাবারের মতোই কয়েক দিনের মধ্যে খেয়ে নেওয়া নিরাপদ। প্যাকেটজাত খাবার হলে প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
গন্ধ দেখে নিরাপত্তা বোঝা যায় না: খাবার দেখতে বা গন্ধে স্বাভাবিক মনে হলেই যে সেটি নিরাপদ, এমন নয়। ক্ষতিকর কিছু ব্যাকটেরিয়া খাবারের গন্ধ, স্বাদ বা চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না এনেও অসুস্থতা তৈরি করতে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগও সতর্ক করেছে যে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সব সময় দেখা, গন্ধ পাওয়া বা স্বাদ নেওয়ার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায় না। তাই শুধু একটু চেখে দেখে খাবার ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করা উচিত নয়।
আবার গরম করার নিয়ম: ফ্রিজ থেকে বের করে শুধু হালকা গরম করলেই হবে না। অবশিষ্ট খাবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে গরম করা উচিত। মার্কিন কৃষি বিভাগ রান্না করা অবশিষ্ট খাবার ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত গরম করার পরামর্শ দেয়। তবে গরম করলেই দীর্ঘ সময় বাইরে পড়ে থাকা বা ভুলভাবে সংরক্ষণ করা খাবার নিরাপদ হয়ে যায় না। খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকলে সেটি ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
সহজ নিয়ম: দুই ঘণ্টার নিয়ম মনে রাখুন—রান্না করা বা নষ্ট হওয়ার মতো খাবার ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখুন। প্রচণ্ড গরমে সময়টি ১ ঘণ্টা। ফ্রিজ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখুন; সম্ভব হলে থার্মোমিটার দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন। খাবার ছোট পাত্রে ভাগ করুন, কারণ বড় হাঁড়িতে গরম খাবার রেখে দিলে ভেতরের অংশ ধীরে ঠান্ডা হয়। কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, যাতে কাঁচা মাংস, মুরগি ও মাছের রস অন্য খাবারে না লাগে। চার দিনের নিয়ম মনে রাখুন—বেশির ভাগ রান্না করা খাবার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলুন। এরপর খাবারটি দেখতে ভালো হলেও ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন না থাকলে ফ্রিজারে রাখুন; হিমায়িত খাবার দীর্ঘ সময় নিরাপদ থাকতে পারে, যদিও সময়ের সঙ্গে স্বাদ ও গুণগত মান কমতে পারে।
ফ্রিজে রাখা মানেই খাবার অনির্দিষ্টকাল ভালো থাকবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। কখন খাবার রান্না হয়েছে, কতক্ষণ বাইরে ছিল, কী তাপমাত্রায় রাখা হয়েছে এবং কীভাবে পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়েছে—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। রান্না করা খাবার ২ ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা, ফ্রিজের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে রাখা এবং অধিকাংশ রান্না করা খাবার ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে ফেলা নিরাপদ খাদ্য সংরক্ষণের সহজ নিয়ম। খাবারের ক্ষেত্রে একটু সতর্কতা অনেক সময় খাদ্যে বিষক্রিয়া ও পেটের নানা সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে।
সূত্র: এই সময় অনলাইন