শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে শত শত আলোকসজ্জিত নৌকায় উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও নাচের আয়োজন চললে হরিপুর সংযোগ সেতুতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। বিনোদনের আড়ালে মাদক সেবন ও উশৃঙ্খলতার অভিযোগ উঠলেও স্থানীয় প্রায় লাখো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর প্রবেশমুখে ও উপরদিকে কয়েক হাজার মানুষ নদীতে চলাচলকারী নৌকার আলোকসজ্জা ও অনুষ্ঠান উপভোগ করতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফলে পথচারী, মোটরসাইকেল ও অটোরিকশাসহ যানবাহন চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মতে, শুক্রবারগুলোতে হরিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জন্য সেতু পার হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। জরুরি প্রয়োজনে রোগী হাসপাতালে নেওয়া বা শহরে যাওয়া-আসা করতে তারা কষ্ট পান।

হরিপুর এলাকার বাসিন্দা অপু বলেন, "শুক্রবার হলেই আমরা কোনোভাবেই ঠিকমতো ব্রিজ পার হতে পারি না। মোটরসাইকেল, পায়ে হেঁটে কিংবা অটোতে পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নেওয়াটাও কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা দ্রুত এই সমস্যা থেকে নিস্তার চাই।"

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা লালটু বলেন, "আমরা খুবই সমস্যার মধ্যে রয়েছি। নদীতে যেমন বিকট শব্দে গান-বাজনা হয়, তেমনি ব্রিজ দিয়েও ঠিকমতো পার হতে পারি না। এই কষ্ট থেকে নিস্তারের জন্য প্রশাসনের কাছে জোর আবেদন জানাচ্ছি।"

অন্যদিকে ব্রিজে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী গিয়াস উদ্দিন বলেন, "আমরা একটু বিনোদনের জন্য পরিবার নিয়ে এখানে আসি। কিন্তু এখন যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে পা রাখারও জায়গা নেই। আজ যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, পরবর্তীতে অন্তত ব্রিজে কাউকে না দাঁড়াতে আহ্বান জানানোর মতো পরিবেশ হয়েছে।"

কুষ্টিয়া শহরের কমলাপুর বাঁধ থেকে মহাশ্মশানঘাট এবং হরিপুরের মোহনা থেকে কয়া ঘাট পর্যন্ত গড়াই নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ‘আরবিকে’, ‘ড্রাগন বয়’, ‘রেড এলার্ট’, ‘ক্ষ্যাপা কিং’, ‘মাফিয়া’, ‘জিরো পয়েন্ট’সহ বিভিন্ন নামে যুবগোষ্ঠী ও মহল্লাভিত্তিক গ্রুপগুলো পিকনিকের আয়োজন করে। প্রতিটি নৌকায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জন মানুষ উঠতে দেখা গেছে। স্থানীয় তরুণরা বন্ধুদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। নৌকাগুলো বাহারি আলোকসজ্জা ও বিশালাকার সাউন্ড সিস্টেমে সজ্জিত। কে কত জাঁকজমকপূর্ণ নৌকা নামাতে পারেন এবং কে কত বড় সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করতে পারেন, নিয়ে আয়োজকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছিল। নৌকা-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, একটি নৌকা সাজানো ও সার্বিক আয়োজনে খরচ হয় প্রায় ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা। শুধুমাত্র সাউন্ড সিস্টেমের পেছনে ক্ষেত্রবিশেষে ব্যয় হয় ৫০ হাজার থেকে ৮ লাখ টাকা।

নৌকার এমন অনিয়ন্ত্রিত আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে পিকনিকে অংশগ্রহণকারী শিমুল নামের এক তরুণ বলেন, "আমরা তো কারও ডিস্টার্ব করছি না। একটু আনন্দের জন্য নৌকায় উঠি, গান করি। আমরা সবাই ভাই-ব্রাদার মিলে চাঁদা তুলে নৌকায় উঠেছি, কারও তো কোনো ক্ষতি করছি না।"

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু আনন্দ-বিনোদনের মধ্যে এসব আয়োজন সীমাবদ্ধ থাকছে না। উচ্চ শব্দে গান, অশ্লীল নাচ এবং উন্মুক্ত মাদক সেবনের অভিযোগও রয়েছে প্রবল। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। ভবের হাট সংস্থার সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "বিনোদনের অধিকার সবার আছে। কিন্তু সেই বিনোদনের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হলে, উচ্চ শব্দে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে কিংবা মাদক ও অশালীন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি আর নিছক বিনোদন থাকে না।" তিনি আরও বলেন, "একই সঙ্গে নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে বড় ধরণের নৌদুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। একটি দুর্ঘটনাই কেড়ে নিতে পারে অসংখ্য প্রাণ। তাই নৌকার ধারণক্ষমতা, লাইফ জ্যাকেট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, নৌযানের বৈধতা এবং আয়োজকদের কর্মকাণ্ড নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা জরুরি।"

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম জানান, "অভিযান অব্যাহত আছে। নৌকার মালিকদের সাথে কথা বলেছিলাম। তবে মনে হচ্ছে, কিছু নৌকা জেলার বাইরে থেকেও এসেছে। গড়াই নদীতে নৌযান পিকনিক ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।"