জামালপুরের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে রাজিব পরিবহনের একক আধিপত্য রয়েছে বলে অভিযোগ। এই একক নিয়ন্ত্রণের কারণে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পথে অন্য যেকোনো পরিবহনের বাস চলাচলের সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে এখানে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ মাসে জেলার বিভিন্ন সড়কে রাজিব পরিবহনের বাসে অন্তত আটটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৩৫ জন আহত হয়েছেন।

সর্বশেষ গত সোমবার রাতে সদর উপজেলার লাহিড়ীকান্দা এলাকায় রাজিব পরিবহনের বাস ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে বাসটির সহকারীসহ চারজন নিহত হন। এর আগেও এই পরিবহনের বাসের সঙ্গে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভটভটি ও ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ দুর্ঘটনার প্রতিবাদে ‘ছাত্র-জনতা’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ছাত্রশক্তি, যুবশক্তি ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। তবে মানববন্ধন চলাকালে পরিবহনশ্রমিকদের অর্ধশত লোকজন সেখানে হামলা চালিয়ে প্রতিবাদকারীদের মারধর করেন। এতে কয়েকজন আহত হন। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, "খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।"

জামালপুর–ঢাকা রুটে ময়মনসিংহ হয়ে রাজিব পরিবহনের ৫৫–৬০টি বাস চলাচল করে। এর বাইরে বিআরটিসি, শেরপুর ট্রাভেলসসহ হাতে গোনা কয়েকটি বাস চলে। আন্তজেলা বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকায় প্রায় ৫০টি বাস চলে, তবে সেগুলোর সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে রাজিব পরিবহনের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় যাত্রীদের অভিযোগ, বিকল্প পরিবহনের সুযোগ সীমিত থাকায় তাঁদেরকে এই পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাদের প্রভাবের কারণে অন্য পরিবহনগুলোকে চলাচলের অনুমতি ও সুযোগ দেওয়া হয় না। ফলে যাত্রীদের গুটিকয় পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে রাজিব পরিবহনের বাস বন্ধ হয়ে গেলে পুরো জেলার পরিবহনব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়ে।

যাত্রীরা জানান, রাজিব পরিবহনের বাসগুলো অতিরিক্ত গতিতে চলাচল করে। যত্রতত্র বাস থামানো, চালকদের দায়িত্বহীনতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জামালপুর শহরের বাসিন্দা আতিকুর রহমান বলেন, "সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।" সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের লাইসেন্স ও মাদকাসক্তি পরীক্ষা, যত্রতত্র বাস থামানো বন্ধ এবং নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও বাস কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আন্দোলনের সময় রাজিব পরিবহনের দুটি বাস আটকে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া, চালক ও সহকারীদের মারধর এবং বাস ভাঙচুরের অভিযোগ করেন পরিবহনশ্রমিক নেতারা।

বিষয়টি নিয়ে জামালপুর জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। আরও যেসব সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধান করে রাজিব পরিবহনের আধুনিকায়ন করা হবে।" সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, "ময়মনসিংহ হয়ে ঢাকায় চলাচলকারী রুটে এসি বাস চালুর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজিব পরিবহনের ফিটনেসবিহীন বাসগুলো বাতিল করা হয়েছে। মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানোও বন্ধ করা হবে। পাশাপাশি বাসে সিভি ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও গতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে।" অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, "রাজিব পরিবহনের বাসসেবা নিয়ে পরিবহনশ্রমিক নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। সেখানে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে এসেছে। বাসসেবা কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় উঠে আসা অন্য সমস্যাও সমাধানের চেষ্টা করা হবে।"