বরিশাল নগরীতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাদকের বিস্তার। সহজলভ্যতার সুযোগে এর বড় শিকার হচ্ছে উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কৌশল হিসেবে মাদক সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে নারী ও স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা সত্ত্বেও নদী ও স্থলপথকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে সক্রিয় রয়েছে এই নেটওয়ার্ক।

বরিশাল নগরীর বিভিন্ন অলিগলি, ঝুপড়ি ও পরিত্যক্ত ঘরে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। ইয়াবা ও গাঁজার নেশায় নানা বয়স ও পেশার মানুষ জড়িয়ে পড়ছেন। মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

কৌতূহল থেকে আসক্ত হচ্ছে তরুণেরা

নগরীর অলিগলি, ঝুপড়ি ও পরিত্যক্ত ভবনে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য ও চিকিৎসা কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, আসক্তদের একটি বড় অংশই শিক্ষার্থী। বন্ধুদের সংস্পর্শে গিয়ে সিগারেট বা গাঁজা দিয়ে সূচনা হলেও দ্রুতই তা ইয়াবায় মোড় নেয়। পড়াশোনার খরচ কিংবা বই কেনার অজুহাতে বাসা থেকে টাকা নিয়ে মাদকের পেছনে ব্যয় করছে অনেক কিশোর-তরুণ। মাদক জোগাড় করতে অনেকে জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। সন্তানদের নেশা থেকে মুক্ত করতে অভিভাবকদের একটি অংশ এখন মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করাচ্ছেন।

মাদকাসক্ত রবিন (ছদ্মনাম) বলেন, বন্ধুদের মাধ্যমে প্রথমে গাঁজা সেবন শুরু করি। পরে বন্ধুদের সঙ্গে ইয়াবা সেবন করতাম। একপর্যায়ে ইয়াবা ছাড়া শরীর ভালো লাগত না। তার ভাষ্য, প্রতি পিস ইয়াবা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় এবং ১০০ টাকায় দুই থেকে তিন স্টিক গাঁজা পাওয়া যায়।

আরেক মাদকাসক্ত আহসান (ছদ্মনাম) জানান, একদিন এক বন্ধু বাসায় এসে সিগারেটের সঙ্গে ইয়াবা নিয়ে আসেন। সেদিনই প্রথম ইয়াবা দেখেন তিনি। পরে ইয়াবা সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। বন্ধুদের কাছ থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় ইয়াবা কিনতেন। একপর্যায়ে মাদক বিক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হলে বাসা থেকে কোচিং ও বই কেনার কথা বলে টাকা নিয়ে মাদক কিনতেন। তার দাবি, মাদকের কারণে তিনি ছোটখাটো অপরাধেও জড়িয়ে পড়েছিলেন।

বাড়ছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী

বরিশালের দি নিউ লাইফ মাদকাসক্ত ও মানসিক রোগ চিকিৎসা কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান মর্তুজা জুয়েল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আগে যেখানে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ জন মাদকাসক্ত রোগী ভর্তি হতেন, এখন সেখানে মাসে অর্ধশতাধিক রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তাদের মধ্যে নারীও রয়েছেন। ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশির ভাগই ইয়াবাসেবী।

মর্তুজা জুয়েলের ভাষ্য, ইয়াবায় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের কারণে রোগীদের মধ্যে উগ্রতা, হ্যালুসিনেশনসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

নৌপথে বড় চালান, সড়কে নারী-কিশোরী

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাদক কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলে ইয়াবা ও গাঁজার বড় চালান মূলত নৌপথে আসে। পরে স্থানীয় ডিলারদের মাধ্যমে এসব মাদক বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কারবারিদের দাবি, খুচরা বাজারে প্রতি পিস ইয়াবার দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা হলেও পাইকারিতে তা ১৮০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তাদের ভাষ্য, ১৭ থেকে ২২ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীদের মধ্যে মাদকের চাহিদা বেশি। উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও নিয়মিত ক্রেতা হিসেবে দেখা যায় বলে তারা দাবি করেন।

তারা আরও জানান, সড়কপথে মাদক পরিবহনে নারী-শিশুদের ব্যবহার করা হয়। নারীরা শরীরে মাদক বহন করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যান। আবার নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক পৌঁছে দিতে স্কুলপড়ুয়া কিশোরীদেরও ব্যবহার করা হয় বলে তাদের দাবি। এসব কিশোরী ব্যাগ বা শরীরে করে মাদক পৌঁছে দিয়ে পারিশ্রমিক পায়।

কারবারিদের দাবি, বরিশাল নগরীর কেডিসি, রসুলপুর, নতুন বাজার ও নথুল্লাবাদ এলাকায় মাদক বিক্রির কার্যক্রম রয়েছে। খুলনা হয়ে সড়কপথেও মাদক আসে বলে তারা জানান। তবে মাদক কারবারিদের এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মাদকসহ পুলিশ কনস্টেবল গ্রেপ্তার

মাদক কারবারিদের প্রশাসনের একাংশের সহযোগিতার অভিযোগের মধ্যে গত ৪ জুন বরিশাল নগরীর কেডিসি এলাকা থেকে ইয়াবা ও গাঁজাসহ তনহাদ আহমেদ নীরব (২৫) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্টিমারঘাট ফাঁড়ির পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। বিষয়টি নিশ্চিত করেন কোতোয়ালি মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম। পরে তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয় এবং আদালতের মাধ্যমে তাকে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

দেড় বছরে ২৫৮৯ অভিযান

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বরিশাল অঞ্চলে ২ হাজার ৫৮৯টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৮২১টি মামলা করা হয় এবং ৯১৭ জনের বেশি মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। শুধু ২০২৫ সালে ১ হাজার ৯০৭টি অভিযান পরিচালনা করে ৬৪১টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে নিয়মিত মামলা ছিল ১৭৬টি এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৪৬৫টি মামলা পরিচালিত হয়। এসব মামলায় ৭০৪ জনকে আসামি করা হয়।

ওই সময়ে ৭১ কেজি ৭২৩ গ্রাম গাঁজা, ১৫ হাজার ৪৬৫টি ইয়াবা, ৯৮ বোতল ফেনসিডিল, ৮২৫ অ্যাম্পুল মরফিন ইনজেকশন, ৩৩০ অ্যাম্পুল ইজিয়াম ইনজেকশন, ৩০২ অ্যাম্পুল ফেনারেক্স ইনজেকশন, ২ অ্যাম্পুল ন্যালবান ইনজেকশন, ২ ক্যান বিয়ার ও ২ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭১২ টাকা, একটি অটোরিকশা, একটি মোটরসাইকেল ও দুটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে— এই পাঁচ মাসে ৬৮২টি অভিযান পরিচালনা করে ১৮০টি মামলা করা হয়। এসব মামলায় ২১৩ জনকে আসামি করা হয়। এ সময়ে ৩৩ কেজি ৭৪০ গ্রাম গাঁজা, ৩ হাজার ৬১টি ইয়াবা, ৭ গ্রাম ইয়াবার গুঁড়া, ২১৬ অ্যাম্পুল মরফিন ইনজেকশন, ৪০ বোতল ফেনসিডিল, ১৫৫ অ্যাম্পুল ইজিয়াম ইনজেকশন, ১০৫ অ্যাম্পুল সিডিল ইনজেকশন, ২৪০ অ্যাম্পুল ফেনারেক্স ইনজেকশন, ৩ ক্যান বিয়ার ও ১ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ১৯ লাখ ৪২ হাজার ৯৫২ টাকা, চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ব্যক্তিগত গাড়ি জব্দ করা হয়।

ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সহকারী অধ্যাপক আলমগীর হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বর্তমান সময়ে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার পাশের সাধারণ ফার্মেসির মতো সহজেই নেশাজাতীয় দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ইচ্ছা করলেই একজন তরুণ খুব সহজে মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ছে। যুবসমাজই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের শক্তি। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠী যদি মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ আরও কার্যকর ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজে আইন যদি কঠোরভাবে এবং যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে অনেকাংশে রক্ষা করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ছোট ছোট অভ্যাস থেকেই অনেক সময় বড় ধরনের অপরাধ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্ম নেয়। তাই সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই তা চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে মাদকমুক্ত একটি সুস্থ ও নিরাপদ যুবসমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

প্রশাসনের বক্তব্য

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বরিশালের উপপরিচালক মো. তানভীর হোসেন খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতির আলোকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদক কারবারিদের কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক পাচার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও ধর্মীয় নেতাদেরও সচেতনতা বৃদ্ধিতে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইমদাদ হুসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাদক প্রতিরোধে আমরা সবসময় কাজ করছি। বিগত দিনে চিহ্নিত অনেক মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এরই মধ্যে বড় বড় চালানও আমরা ধরেছি। আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা দিয়ে কাজ করছি।

বরিশাল নৌ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নৌপথে মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই তাৎক্ষণিক অভিযান চালানো হয়। চলতি মাসে মুলাদীতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইয়াবার চালান আটক করে মামলা করা হয়েছে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বরিশালের জেলা প্রশাসক মো. মামুন খন্দকার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান কঠোর, জিরো টলারেন্স। কোনো অপরাধী বা মাদক কারবারির জন্য কোনো ছাড় নেই। আমরা জানতে পেরেছি, বরিশালে মাদকের বড় একটি অংশ নৌপথে প্রবেশ করে। এ কারণে নৌ পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কপথেও কঠোর নজরদারি চলছে। মাদক সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারো কাছে যদি তথ্য থাকে সেটা আমাদের দিয়ে সহায়তা করবেন আশা করি। মাদকমুক্ত বরিশাল গড়তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।