চুয়াডাঙ্গার বকচর বিল ও রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় জলকোপি গোত্রের দুটি বিরল পাখি—জলপিপি ও নেউপিপি—কে ছানাসহ দেখা গেছে। বন্য প্রাণী সংরক্ষক ও শিক্ষক বখতিয়ার হামিদের আমন্ত্রণে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি গ্রামের এই বিলে যাওয়ার সময় বিশেষ এই পাখিটিকে ছানাসহ দেখা যায়। এরপর চলতি বছরের মে মাসে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিচিকিৎসা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের মাঠকর্মে নিয়ে যাওয়া হলে জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রাকৃতিক জলাভূমিতে একই গোত্রের আরেক প্রজাতির পাখি প্রজননরত অবস্থায় দেখা যায়।
বকচর বিল ছোট হলেও এর প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত অনুকূল। এখানে বক, ডাহুক, জলমুরগি, মাছরাঙা, সরালি হাঁসসহ বিভিন্ন জলচর পাখির আবাস। বর্ষা শেষে শরৎকালে তালপাকা গরমে ক্যামেরা হাতে বিলের চারদিকে ঘুরতে গিয়ে হঠাৎ একটি বিশেষ পাখি দুটি ছানাসহ উপস্থিত হয়। পাঁচ-ছয় ফ্রেম ক্লিক করার পর বৃষ্টি নামায় ভালো ছবি তোলা সম্ভব হয়নি। পরদিন সকালে রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় বিলের ধারে হাঁটতে গিয়ে তিনটি ছানা দেখা যায়, যাদের বয়স তিন-চার সপ্তাহ হবে। ঘণ্টাখানেক পর বয়স্ক পাখিটি আসায় চমৎকার ছবি তোলা সম্ভব হয়। ঘটনাটি ২০১৮ সালের ২১ থেকে ২২ সেপ্টেম্বরের।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ২ মে জাতীয় চিড়িয়াখানায় গিয়ে মায়া হরিণশালার উল্টো পাশের প্রাকৃতিক জলাভূমিতে জলকোপি গোত্রের আরেক প্রজাতির পাখি প্রজননরত দেখা যায়। এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকেও ছানাসহ এই পাখিগুলো দেখা গেছে।
জলকোপি বা Jacanidae গোত্রের এই পাখিগুলোর মাঝারি আকার ও দীর্ঘ পায়ে আঙুলগুলো মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো থাকে, যা দিয়ে তারা অনায়াসে জলজ উদ্ভিদের ওপর দিয়ে হাঁটতে পারে। এই গোত্রের স্ত্রী পাখিরা ডিম পেড়েই খালাস পায় এবং ডিম তা দেওয়া ও ছানা লালনপালনের দায়িত্ব শুধুমাত্র পুরুষের ওপর ন্যস্ত। চেহারা ও আচরণে খেনি বা Railidae গোত্রের পাখির মিল থাকলেও এরা মোটেও তাদের নিকটাত্মীয় নয়; বরং বাটান ও গুলিন্দাদের নিকটাত্মীয়। পালক বর্ণিল ও উজ্জ্বল হওয়ায় এরা স্বাদুপানির ছোট জলাশয়, হ্রদ ও পুকুরে সহজেই দেখা যায়। সারা বিশ্বে এই গোত্রের আট প্রজাতির অস্তিত্ব থাকলেও বাংলাদেশে মাত্র দুটি—জলপিপি ও নেউপিপি।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় দেখা চকচকে নীলচে-বেগুনি-কালো পাখিটির নাম জলপিপি বা দলপিপি (ব্রোঞ্জ-উইঙ্গড জ্যাকানা বা Metopidius indicus)। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার বকচর বিলের পাখিটি হলো নেউপিপি, নেউ, পদ্মপিপি, মেওয়া বা জলময়ূর (ফিজ্যান্ট-টেইল্ড জ্যাকানা বা Hydophasianus chirurgus)। উভয়ই এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এদের দেখা মেলে। জলপিপি ভাসমান পাতার ওপর হেঁটে জলজ উদ্ভিদের কচি পাতা, অঙ্কুর, বীজ, পোকামাকড় ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। জলপিপি ‘সিক-সিক-সিক...’ এবং নেউপিপি ‘নে-উ-ইউ...নে-উ-ইউ...নে-উ-ইউ...’ শব্দে ডাকে।
উভয় প্রজাতির প্রজননকাল মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। স্ত্রীরা এক মৌসুমে একাধিক পুরুষের সঙ্গে মিলিত হয়। শাপলা, পদ্ম বা ভাসমান কোনো উদ্ভিদের পাতার ওপর বাসা বানিয়ে চারটি চকচকে ডিম পাড়ে। জলপিপির ডিম বেগুনি কারুকাজসহ লালচে-বাদামি এবং নেউপিপিগুলো জলপাই-বাদামি রঙের হয়। পুরুষ একাই ডিম তা দেয় ও ছানাদের লালনপালন করে। ডিম ফোটে ২৩ থেকে ২৬ দিনে। ছানাগুলো ডিম থেকে ফোটার সাথে সাথেই হাঁটা, সাঁতার কাটা ও ডুব দিতে সক্ষম হয়।
আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়