রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ তাদের সংগ্রহে থাকা নিঃসঙ্গ প্রাণীদের সঙ্গী করতে এবং দর্শনার্থীদের আকর্ষণ বাড়াতে নতুন প্রাণী কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। চলতি অর্থবছরে দুটি চিতাবাঘ, তিনটি সিংহ, দুটি হায়েনা ও তিনটি উল্লুক কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। এসব প্রাণী সংগ্রহের জন্য ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রাণীগুলো দেশে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম মুক্তকণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেছেন, “চিড়িয়াখানায় থাকা সিংহ, হায়েনা ও উল্লুকের সঙ্গী নেই। দীর্ঘ সময় ধরে তারা নিঃসঙ্গ। তারা যেন সঙ্গী পায়, সে জন্য এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া চিড়িয়াখানায় কোনো চিতাবাঘ নেই। এই প্রাণীর প্রতি দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। তাই চিতাবাঘও কেনা হবে।”

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চিতাবাঘ, সিংহ, হায়েনা ও উল্লুক কেনার জন্য গত ১২ অক্টোবর ইজিপিতে (ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা) দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৬ অক্টোবর উক্ত দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে যেসব প্রতিষ্ঠান প্রাণী সরবরাহের জন্য আবেদন করেছে, তাদের আবেদনগুলো মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আগামী বছরের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রাণীগুলো চিড়িয়াখানায় পৌঁছাতে পারে।

জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে একটি চিত্রা হায়েনা ও একটি ডোরাকাটা হায়েনা রয়েছে। চিত্রা হায়েনাটি ২০১৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে সঙ্গীহীন অবস্থায় রয়েছে এবং ডোরাকাটা হায়েনাটিরও কোনো সঙ্গী নেই। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি করে চিত্রা ও ডোরাকাটা হায়েনা কেনা হবে যাতে বিদ্যমান হায়েনা দুটি সঙ্গী পায় এবং তারা প্রজনন করতে পারে।

সিংহের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ‘দীপ’ নামের আফ্রিকান সাদা সিংহটি ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে সঙ্গীহীন। এছাড়া মুক্তা ও ডেইজি নামের দুটি আফ্রিকান স্ত্রী সিংহ রয়েছে, যাদের মধ্যে মুক্তা ২০১৯ সাল থেকে এবং ডেইজি ২০২৩ সাল থেকে পুরুষ সঙ্গীহীন। এই পরিস্থিতি নিরসনে তিনটি আফ্রিকান সিংহ কেনার দরপত্র দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দুটি পুরুষ ও একটি মাদি থাকবে। এতে নিঃসঙ্গ সিংহী দুটি সঙ্গী পাবে। বর্তমানে চিড়িয়াখানায় পাঁচটি সিংহ রয়েছে; নতুন তিনটি কিনলে মোট আটটি হবে। এর মধ্যে এক জোড়া সিংহ রংপুর চিড়িয়াখানায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

উল্লুকের ক্ষেত্রেও একই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চিড়িয়াখানায় একটি উল্লুক রয়েছে যা ২০২২ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে নিঃসঙ্গ। কর্তৃপক্ষ তিনটি উল্লুক কেনার দরপত্র দিয়েছে, যার মধ্যে দুটি পুরুষ ও একটি মাদি। এর ফলে বিদ্যমান উল্লুকটি সঙ্গী পাবে এবং বাড়তি এক জোড়া উল্লুকও আনা হবে।

জানা গেছে, জাতীয় চিড়িয়াখানায় বর্তমানে মোট ১০টি প্রাণী সঙ্গীহীন জীবন কাটাচ্ছে। এদের মধ্যে রয়েছে গন্ডার, কেশোয়ারি পাখি, ক্যাঙারু, ইন্ডিয়ান সারস ক্রেন, হামাদ্রিয়াস বেবুন, উল্লুক, কুলু বানর, আফ্রিকান সাদা সিংহ, চিত্রা হায়েনা ও ডোরাকাটা হায়েনা। কোনোটি প্রায় ১৭ বছর ধরে একা আছে, আবার কোনোটি এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে নিঃসঙ্গ।

এছাড়া এমন কিছু প্রাণী রয়েছে যাদের প্রজাতির অন্য সদস্য থাকলেও বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী নেই। যেমন—দুটি আফ্রিকান স্ত্রী সিংহ, দুটি পুরুষ হনুমান লেঙ্গুর, লোনাপানির তিনটি পুরুষ কুমির ও মিঠাপানির দুটি পুরুষ কুমির। চলতি অর্থবছরে হায়েনা, সিংহ ও উল্লুককে সঙ্গী দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে অন্য প্রাণীগুলোর জন্যও সঙ্গী কেনার পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চারটি চিতাবাঘ কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। তবে গত ৩০ জুন অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে ২৩ জুনের মধ্যে বিল জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কার্যাদেশে ২০ জুনের মধ্যে চিতাবাঘ সরবরাহের শর্ত থাকলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সময়মতো তা করতে ব্যর্থ হয়, ফলে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়। এবার চলতি অর্থবছরে পুনরায় দুটি চিতাবাঘ কেনার জন্য দরপত্র দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালকের কার্যালয় জানিয়েছে, শেষ মুহূর্তে যেন আর কোনো জটিলতা তৈরি না হয়, সেজন্য এবার অনেক আগেই প্রাণী কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির মধ্যে চিতাবাঘসহ দরপত্রের সব প্রাণী আনা সম্ভব হবে।

গত অর্থবছরে চিতাবাঘ আনতে ব্যর্থ হলেও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি কমন ইল্যান্ড ও দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট আমদানি করা হয়েছিল। কমন ইল্যান্ডের একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী এবং ওয়াইল্ড বিস্ট দুটিই পুরুষ। গত জুনে তাদের জাতীয় চিড়িয়াখানায় আনা হয়।

গত ২৪ অক্টোবর সরেজমিনে দেখা যায়, কমন ইল্যান্ড দুটি একটি খাঁচায় সবুজ ঘাস খাচ্ছিল এবং তাদের বেশ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী মনে হয়েছে। পুরুষ ওয়াইল্ড বিস্ট দুটির খাঁচায় আরও দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট রয়েছে, অর্থাৎ মোট চারটি ওয়াইল্ড বিস্ট একটি খাঁচায় একসঙ্গে ঘাস খাচ্ছিল।

জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গত অর্থবছর আমদানি করা প্রাণীগুলো ভালো আছে। বেশ বড় হয়ে গেছে। দেখতেও সুন্দর হয়েছে। কমন ইল্যান্ড দুটির প্রজননের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে। ওয়াইল্ড বিস্ট দুটিও আগের দুটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে গেছে।”