সীমান্ত পেরিয়ে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্য চিতাবাঘটির সন্ধান তিন দিনেও মেলেনি। স্থানীয়দের ধারণা, বাঘটি ভারতে ফিরে যেতে ব্যর্থ হয়ে বাংলাদেশের ভেতরেই অবস্থান করছে। নিখোঁজ হওয়ার স্থানের কাছেই ঘন শালবন থাকায় সেখানে বাঘটি আত্মগোপন করে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে বাঘের ভয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। রাতের অন্ধকারে লাঠিসোঁটা ও টর্চলাইট হাতে দল বেঁধে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় যুবকেরা। গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে এবং মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সিঙ্গিমারি এলাকায় আবারও বাঘ দেখার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও তীব্র হয়। শালবনের কাছাকাছি এলাকায় বাঘটির সন্ধান না মেলায় এবং নতুন করে বাঘ দেখার খবর ছড়িয়ে পড়ায় পুরো হাতীবান্ধা উপজেলায় উদ্বেগ বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতার কারণে বাঘটি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ফিরে যেতে পারেনি। আমঝোল সীমান্ত ও সিঙ্গিমারি এলাকায় সর্বশেষ বাঘটি দেখা যাওয়ার পর থেকে তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ওই স্থান থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে শালবন থাকায় স্থানীয়দের ধারণা, দিনের বেলায় মানুষের ভিড় ও হইচই এড়াতে বাঘটি বনের ভেতরে অথবা আশপাশের ঘন ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে আছে। রাতে খাবার কিংবা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সেটি বের হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিঙ্গিমারি এলাকার বাসিন্দা সোলায়মান আলী (৫৫) বলেন, “বাঘটা ভারতে ফিরে যেতে পারেনি। ওপারে কাঁটাতার আর এপারে মানুষের হইচই দেখে ভয় পেয়ে সীমান্ত পার হতে না পেরে কাছের শালবনে ঢুকে গেছে বলে আমাদের ধারণা। নিখোঁজ হওয়ার জায়গা থেকে শালবন খুব বেশি দূরে নয়। আমরা দিনের বেলাতেও একা বের হতে পারছি না, রাতে তো দূরের কথা।”

আমঝোল গ্রামের আলামিন হোসেন (৩২) বলেন, “রোববার রাতে ড্রোনে যেটি দেখা গিয়েছিল, সেটি চিতাবাঘ। বাঘটি যেখানে সর্বশেষ দেখা গেছে, সেখান থেকে শালবন খুব কাছেই। আমাদের ধারণা, বনের ভেতরে কিংবা ঘন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে আছে। এ কারণে রাতে কেউ ঘুমাতে পারছি না।”

বাঘটি লোকালয়ে ঢুকে শিশু কিংবা গবাদিপশুর ক্ষতি করতে পারে—এমন আশঙ্কায় হাতীবান্ধার কয়েকটি গ্রামের যুবকেরা দল বেঁধে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন। তাদের হাতে থাকছে লাঠিসোঁটা, বাঁশের কঞ্চি ও টর্চলাইট। সন্ধ্যার পর গ্রামগুলোতে নেমে আসছে নীরবতা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। বাঘের সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে মসজিদ থেকেও সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়েছে।

গোতামারী এলাকার দিনমজুর মজিবর রহমান (৪৫) বলেন, “বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছি না। কখন শালবন থেকে বের হয়ে কার ওপর হামলা করে, বলা যায় না। গ্রামের যুবকেরা দল বেঁধে সারা রাত টর্চলাইট হাতে পাহারা দিচ্ছেন। কোথাও একটু পাতাও নড়লে আমরা চমকে উঠছি।”

একই এলাকার গৃহিণী রাশেদা বেগম (৩৮) বলেন, “রোববার তিনজন হাসপাতালে যাওয়ার পর থেকে চরম আতঙ্কে আছি। ছাগল-গরু গোয়ালে রেখে দরজায় শক্ত করে তালা দিয়ে রাখি। রাতে ঘরের বাতি নেভাতেও ভয় লাগে।”

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, “মঙ্গলবার রাতেও খবর ছড়িয়েছে, সিঙ্গিমারির শালবনের ভেতরে বা কাছাকাছি বাঘটিকে দেখা গেছে। শালবন বেশি দূরে না হওয়ায় এই খবর ছড়ানোর পর কেউ ঘুমাতে পারেনি। পুলিশ-বিজিবি টহল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বাঘটিকে খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত আমরা শান্ত হতে পারছি না।”

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন জানান, সিঙ্গিমারিতে বাঘ দেখার খবর পাওয়ার পর সেখানে বিশেষ দল পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার স্থানসংলগ্ন শালবন ও আশপাশের এলাকায় ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে মঙ্গলবার সকালে তারা অভিযান বন্ধ করে ঢাকায় ফিরে গেছেন বলে জানান তিনি।

এর আগে, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ড্রোন ব্যবহার করেও বাঘটির অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। তবে এলাকায় নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়। বিজিবি, পুলিশ ও বন বিভাগের উদ্ধারকারী দল যৌথভাবে তল্লাশি চালাচ্ছে।

এদিকে বাঘের সন্ধানে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে ফসলের ক্ষতি হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাদের অভিযোগ, কৌতূহলী মানুষের ভিড় এবং তল্লাশিতে উদ্ধারকারী দলের যাতায়াতের কারণে জমির পাকা ও আধা-পাকা ধানসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভুক্তভোগী কৃষকেরা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাঘ নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিজিবি, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বাঘটি বাংলাদেশের কোথাও লুকিয়ে আছে বলে ধারণা পাওয়া গেলে সেখানে অভিযান চালানো হবে।

এর আগে, গত রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারসংলগ্ন এলাকায় ভারতের দিক থেকে আসা বাঘটি প্রথম হামলা চালায় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ধানক্ষেতে ছাগল আনতে গেলে আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগমের (৩৪) ওপর বাঘটি ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে নজরুল ইসলাম (৪৩) ও আফসার আলী (৪০) নামে আরও দুজন গুরুতর আহত হন। তারা বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ঘটনার পর বিজিবি ফাঁকা গুলি ছুড়ে ও মাইকিং করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ওই দিন মধ্যরাতে ড্রোনের ক্যামেরায় সীমান্তের কাছে বাঘটিকে দেখা গেলেও পরে ঘন কুয়াশা, গাছপালা ও আশপাশের শালবনের কারণে সেটি নজরদারির বাইরে চলে যায়। এরপর থেকে বাঘটির অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।