চট্টগ্রামের রাউজানে গত বৃহস্পতিবার রাতে একদল সন্ত্রাসী স্থানীয় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ করিমকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাত সাড়ে ৯টার দিকে করিম কেরানীহাট বাজারে প্রবেশ করলে ৪-৫টি মোটরসাইকেলে আসা সন্ত্রাসীরা তাকে ঘিরে ফেলে। এরপর একজন তার ঘাড় ও মাথায় কিরিচ দিয়ে কোপ দেয়। করিম রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে আরও কয়েকজন তাকে গুলি করে। পরে করিমের মৃত্যু নিশ্চিত করে সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
নিহত করিম রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশে ফিরে আসেন। তিনি বিএনপির বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশে সক্রিয় ছিলেন। এলাকায় তিনি যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও কোনো পদপদবি ছিল না। করিম একসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। পরে বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় প্রবাসী হন। দুই বছর ধরে এলাকায় ফিরে এসে মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে যুক্ত হন তিনি। পরিবার নিয়ে থাকতেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের আমান বাজারে। মাঝেমধ্যে দিনে নিজ এলাকায় ঘোরাফেরা করলেও রাতে আমানবাজারের বাসায় ফিরে যেতেন। পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে তার।
পুলিশ জানায়, করিম অন্তত ১০টি মামলার আসামি। চুরি, মাদক, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলা করা হয়েছে। তিনি একাধিকবার জেলও খেটেছেন।
রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মুহাম্মদ বেলায়াত হোসেন বলেন, সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব থেকে এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে। খুনের পর বাজারটি লোকশূন্য হয়ে পড়ায় কীভাবে, কেন এই খুনের ঘটনা ঘটল—পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানতে পারেনি। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তিনি আরও বলেন, করিমের শরীরে তিন জায়গায় গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেছে অস্ত্রধারীরা। সুরতহাল প্রতিবেদন অনুযায়ী, করিমের পেটে, ঊরুতে ও নিতম্বে গুলি লেগেছে। একটি গুলি কোমরের পাশ দিয়ে ঢুকে পেট দিয়ে বের হয়ে গেছে। এ ছাড়া ঘাড় ও কপালে কোপের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না।
ঘটনার পর কেরানীহাট বাজারের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি। বাসিন্দারা জানান, শত বছরের পুরোনো এই বাজারে এভাবে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা তারা আগে দেখেননি। করিমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের কেউ ঘরে নেই। তার বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে ১০-১২ জন প্রতিবেশী বসে ঘটনা নিয়ে আলাপ করছেন।
এর আগে ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী বাজারের চৌমুহনী এলাকায় একদল অস্ত্রধারী গুলি করে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে (৪৮) হত্যা করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাউজানে ২৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের জেরে হয়েছে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।