বাংলা একাডেমিতে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) প্রয়াত বিশিষ্ট কবি ও মুক্তিযোদ্ধা আল মুজাহিদীর স্মরণে আয়োজিত সেমিনারে তার সাহিত্যকর্ম ও জীবনদর্শন নিয়ে গভীর আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা তাঁর কবিতায় স্থানীয় মাটি, মানুষ ও মানবতার যে অম্লান ছবি ফুটে উঠেছে, তা তুলে ধরেন এবং নতুন প্রজন্মের জন্য তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রেরণামূলক দিকগুলো উল্লেখ করেন।

একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানের শুরুতে কবি আল মুজাহিদীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা স্বাগত বক্তব্যে বলেন, “আল মুজাহিদী বাংলা কবিতার এক অবিস্মরণীয় নাম। তার কবিতায় এ দেশের মাটি ও মানুষের কথা অসাধারণ নৈপুণ্যে ভাস্বর হয়েছে।”

‘মৃত্তিকার কবি আল মুজাহিদী’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে কবি ও প্রাবন্ধিক ড. মাহবুব হাসান তাঁর সাহিত্যিক যাত্রার গভীরতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আল মুজাহিদীকে চেনার একটি উপায় হলো, তার কবিতা। সেখানেই ফুটে আছে তার মনোগোলাপ, যার সুবাস আমরা নিতে পারি।” ১৯৬৩ সালে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বসে লেখা ‘কাঁদো হিরোশিমা, কাঁদো নাগাসাকি’ কবিতা দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর কাব্যযাত্রা ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনায় রূপ নেয়। ড. হাসান আরও জানান, অনেকের কাছে তিনি ‘মৃত্তিকার কবি’ হিসেবে পরিচিত। গৌড় নগরীর সোনালি তোরণ ও আদিম সভ্যতার টানে তাঁর কবিতায় মৃত্তিকার নানা রূপ ফুটে উঠেছে। যদিও কখনও কখনও তিনি নক্ষত্রের স্তুপে বসবাসের কথা বলেছেন, তবে চূড়ান্তভাবে মৃত্তিকায় ফিরে আসার কথাই তিনি বলে গেছেন। আলোচকদ্বয় হিসেবে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হাসান হাফিজ ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার তাঁর সাহিত্যসেবা, সম্পাদকীয় দক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধে অকুতোভয় অবদান তুলে ধরেন।

সভাপ্রধানের বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম কবির বহুমুখী প্রতিভার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আল মুজাহিদী বাংলাদেশের কবিতাঙ্গনের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। কবিতায় দেশজ আধুনিকতার উদ্ভাসনের পাশাপাশি বিদেশি পুরাণেও খুঁজেছেন মানবিক মৈত্রীর স্বর। কবিতা বিষয়ক গদ্য রচনা, বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ কবিতা বাংলায় অনুবাদ এবং শিশুকিশোর সাহিত্যেও তিনি স্বাতন্ত্র্য ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। এ দেশে সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনার ইতিহাসেও কবি আল মুজাহিদীর অবদান কখনও বিস্মৃত হওয়ার নয়।”

কবির কন্যা কবিকন্যা পরমা আল মুজাহিদী তাঁর বাবার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “বাবা সবসময় দেশ ও দেশের মানুষের কথা তার কবিতায় উদ্ভাসিত করেছেন। আল মুজাহিদীর সাহিত্যকর্ম থেকে নতুন প্রজন্ম ভাষা-সাহিত্য ও দেশপ্রেমের প্রেরণা পাবেন নিঃসন্দেহে।”

অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব।