গত দুই থেকে তিন বছরে দেশের ইন্টারনেট ডেটা ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদানের পরিসর ছাড়িয়ে এখন ইন্টারনেট মানেই মূলত ভিডিও কনটেন্ট। অনলাইন শিক্ষা, বিনোদন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, লাইভ খেলা এবং সামাজিক মাধ্যমের রিলস বা ছোট ভিডিও দেখা দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়কালে ইন্টারনেট ডেটার ব্যবহার প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে।

ভিডিও কনটেন্টই এই ডেটা প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক মোবাইল শিল্প সংস্থা জিএসএমএর জরিপে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯৩ শতাংশই ভিডিও কল করা ও অনলাইন ভিডিও দেখার জন্য নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন। এরিকসন মবিলিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মোবাইল ট্রাফিকের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দখল করে আছে ভিডিও স্ট্রিমিং। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্বব্যাপী প্রতি মাসে মোবাইল নেটওয়ার্কে প্রায় ২১০ এক্সাবাইট বা ২১ হাজার কোটি গিগাবাইট ডেটা আদান-প্রদান হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ডিজিটাল চাহিদার ধারাকেই প্রতিফলিত করে।

দেশের মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বিষয়টির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে। তাদের নেটওয়ার্কে গ্রাহকরা প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৫২ হাজার ঘণ্টা বা ২ কোটি ১১ লাখ ২০ হাজার মিনিট ভিডিও কনটেন্ট উপভোগ করেন। প্রতি ২৪ ঘণ্টায় কেবল এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই প্রায় ৪০ বছরের সমতুল্য দীর্ঘ ভিডিও স্ট্রিমিং সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখার মতো বিশাল ডেটা জড়িত। তবে এই চার দশকের সমান কনটেন্ট চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়; ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস, লার্নিং প্ল্যাটফর্মের ক্লাস ও ওটিটি কনটেন্টের ছোট পর্বগুলোও এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।

ভিডিওর এই বিস্তারের পেছনে স্মার্টফোনের প্রসার অন্যতম প্রধান অনুঘটক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশের ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে। পারিবারিক পর্যায়ে সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ, যার মধ্যে শহরে ৬১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং গ্রামে ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। ব্যক্তিপর্যায়ে নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ। জিএসএমএর সমীক্ষা অনুযায়ী, ডিজিটাল দক্ষতার অভাব, ডিভাইসের দাম এবং ডেটার মূল্যের কারণে অনেক নাগরিক এখনো ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

জিএসএমএর ২০২৫ সালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগে মাসে গড়ে প্রায় ৫ জিবি ডেটা ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় কম। বিপুল পরিমাণ ভিডিও ডেটা নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করতে হলে বাফারিং ছাড়া দ্রুত স্ট্রিমিং শুরু এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নেটওয়ার্কের লেটেন্সি সর্বনিম্ন রাখা জরুরি। বিটিআরসির এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ১৮ কোটি ৭ লাখ। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রিপশন ১২ কোটি ৮ লাখের বেশি, যা ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের বিস্তৃত পরিসর নির্দেশ করে।

এই বিশাল নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অবকাঠামো কাজ করছে। সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ২ হাজার ৬০০ মেগাহার্টজের উচ্চ তরঙ্গের স্পেকট্রাম ব্যবহার করা হয়। দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৮৪৫ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক এবং সাবমেরিন কেবল ও আইটিসির মাধ্যমে ৬ হাজার ৬০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা কার্যকর রয়েছে। ভিডিও স্ট্রিমিংয়ের গতি বাড়াতে ‘লোকাল ক্যাশ’ প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মহাদেশ পার হয়ে বৈশ্বিক ডেটা সেন্টারে ফাইল জমা থাকার ফলে বাফারিং তৈরি হওয়া এড়াতে দেশের ভেতরেই স্থানীয় সার্ভারে সচরাচর দেখা ভিডিওগুলোর কপি আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে, যা তাৎক্ষণিক প্লেব্যাক নিশ্চিত করে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা পৌঁছে দেওয়ার মূল ভিত্তি হলো দেশজুড়ে বিস্তৃত টাওয়ার। বিটিআরসির তথ্যমতে, টেলিকম অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলোর যৌথ উদ্যোগে ৪৫ হাজারেরও বেশি নেটওয়ার্ক টাওয়ার সচল রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশের বেশি মানুষকে ফোর–জি নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে। অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে ফাইভ-জি প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটছে। এরিকসনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে ফাইভ–জি গ্রাহকসংখ্যা ৩১০ কোটি পৌঁছেছে। কম লেটেন্সি ও বেশি ডেটা ধারণক্ষমতার কারণে ফাইভ–জি ভবিষ্যতে ভিডিও স্ট্রিমিং, অনলাইন শিক্ষা, ক্লাউডভিত্তিক সেবা ও উচ্চগতির ডিজিটাল ব্যবহারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফোর–জি নেটওয়ার্ক ৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছালেও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন প্রায় ৪৬ শতাংশ। সাশ্রয়ী ডেটা, সহজলভ্য ডিভাইস ও ডিজিটাল দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে আরও কোটি মানুষ ডিজিটাল দুনিয়ায় যুক্ত হবেন, যা ভিডিও কনটেন্টের এই ধারাকে আরও গতিশীল করবে।