রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ চার সদস্যের পরিবার হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগেই আসামি সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস ও কাকা বিজয় দাস তাদের বাড়ি বিক্রি করে ভারতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে প্রকাশ, আলোচিত হত্যাকাণ্ডের আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস মামাতো ও ফুপাতো ভাই। তাদের বাড়ি ছিল গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ঠিক পাশেই। হত্যাকাণ্ডের প্রায় দেড় মাস আগে প্রতিবেশী বিধান চন্দ্র দাসের কাছে ৩৫ লাখ টাকায় ওই বাড়ি বিক্রির বায়না চুক্তি করেন বিনয় ও বিজয় দাস। দলিল সম্পন্ন হয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে সপরিবারে বসবাসের পরিকল্পনা ছিল তাদের।

এ বিষয়ে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, "আমরা দুই ভাই একসঙ্গে থাকি। আমাদের জমি আমরা বিক্রি করতেই পারি। জমি বিক্রি করে নতুন জমি কেনা বা ব্যবসা-বাণিজ্য করা আমাদের বিষয়, এর সঙ্গে অন্য কিছুর সম্পর্ক নেই।" প্রতিবেদকের প্রশ্নে তিনি যোগ করেন, "বায়না বাবদ কিছু টাকা নিয়েছি।"

জমির ক্রেতা বিধান চন্দ্র দাস স্থানীয় একটি স্বর্ণের দোকানের মালিক। তিনি জানান, "বিনয় কাকা নিজে এসে তাকে জায়গাটি কেনার প্রস্তাব দেন, কারণ জমিটি তাদের পাশাপাশি ছিল। তিনি বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে বায়না করে তাকে ২০ লাখ টাকা দিয়েছি। কাগজপত্রের সমস্যার কারণে এখনও রেজিস্ট্রি হয়নি। তার বাবা মারা যাওয়ায় সিটি করপোরেশন থেকে ওয়ারিশান সনদ তুলতে হবে। কাগজপত্র তোলার পরই রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা। মোট ৩৫ লাখ টাকায় আমাদের চুক্তি হয়েছে।"

এই ঘটনায় সচেতন মহল পুনরায় বিষয়টিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, পুলিশ দাবি করেছে মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) তোফায়েল আহমেদ জানান, "শিক্ষক পরিবার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত দুই আসামিকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত যে সময় দিয়েছিলেন, তার শেষ দিন ছিল বুধবার। দুদিনে আসামিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি দিক খতিয়ে দেখছি, কারণ তদন্তের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তদন্তের স্বার্থে যত গভীরে যাওয়া প্রয়োজন, আমরা যাব। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে যা করণীয়, তার সবই করা হবে।"

গত মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত প্রথম দফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় আসামিদের। তবে সেই জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা সংবাদ মাধ্যমকে জানানো হয়নি।

গত ২২ আগস্ট রাতে নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করে সংবাদ সম্মেলন করে পুলিশ। সে সময় দাবি করা হয়, আসামিরা ইয়াবা সেবনের পর এই চার হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং ঘটনাস্থলে মাদকের আলামত পাওয়া গেছে। তবে আদালতের অনুমতি নিয়ে আসামিদের ডোপ টেস্ট করা হলে প্রতিবেদনে শরীরে মাদকের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।

আসামিদের শরীরে মাদকের উপস্থিতি না পাওয়ায় গত ৩১ আগস্ট অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদন জানান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাত আলী। আদালত রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তদন্তের স্বার্থে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন.