প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, পাইলট প্রকল্পে সফলতা অর্জনের পর আগামী বছর থেকে দেশব্যাপী স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হবে। ২০২৭ সাল থেকে ৬৬ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন পুষ্টিকর একবেলা খাবার দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ শুরু করবে। বর্তমানে ১৫০টির বেশি উপজেলায় ৩০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এই কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে খুলনার দ্য গ্র্যান্ড খুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ফিডিং কর্মসূচি বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে এই সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। পাইলট প্রকল্পে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার ১৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
খাবারের মান ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "পাইলট প্রকল্পের শুরুতে খাবারের সরবরাহ ও মান নিয়ে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বর্তমানে এসব সমস্যা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখন নিয়মিত ও ভালো মানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, কোনো বিদ্যালয়ে নির্ধারিত মান বা পরিমাণের খাবার না পৌঁছালে তা গ্রহণ না করে ফেরত পাঠানোর বিধান করা হয়েছে। পচা বা নিম্নমানের কোনো খাবার সরবরাহ করা হলে তা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট টেন্ডার বা অর্ডার তাৎক্ষণিক বাতিল করার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বলেন, "নতুন নীতিমালা চালুর পর গত দুই থেকে আড়াই মাসে পাইলট প্রকল্পের সমস্যাগুলো অনেকটা কমে এসেছে। পাইকগাছাসহ বিভিন্ন উপজেলায় কর্মসূচির বাস্তবায়ন এখন প্রায় ‘জিরো এরর’ এর কাছাকাছি চলে এসেছে। ২০২৭ সালে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।"
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ ও নকশা অনুমোদন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বর্তমান দায়িত্ব নেওয়ার আগে যেসব ভবন নির্মাণ হয়েছে, সেগুলোর নকশা অনুমোদনের বিষয়টি আগের সময়ের। তখনকার কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল না। এখন যেন এ ধরনের সমস্যা না হয় এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়ন করা যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।" রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের বিষয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, "কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বিস্তারিত ও প্রমাণভিত্তিক যাচাই করা প্রয়োজন। সরকার কোনো ধরনের হয়রানি বা নিপীড়নে বিশ্বাস করে না।"
তিনি বলেন, "অনুপযুক্ত বা কম সক্ষম শিক্ষকদের শিক্ষক নীতিমালার আওতায় মূল্যায়ন করা হবে। কে-কখন-কীভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, সেটি নিয়ে শুধু অতীত খুঁজে না গিয়ে বর্তমান কর্মদক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। কোনো শিক্ষক ঠিকভাবে পাঠদান করতে না পারলে কিংবা শ্রেণিকক্ষের দায়িত্ব পালনে সক্ষম না হলে তার বিষয়ে নীতিমালা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।" প্রতিমন্ত্রী বলেন, "কোনো বিদ্যালয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত শিক্ষক থাকলে তাকে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য বিদ্যালয়ে বদলি করা হবে। কোনো শিক্ষকের পদায়ন বেআইনি প্রমাণিত হলে তা পর্যালোচনা করে বাতিল করা হবে এবং তাকে তার মূল পদে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।"
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদান কার্যক্রম তদারকির বিষয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, "বর্তমানে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের (এটিইও) মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রিপোর্টিংয়ের সাহায্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী দিনে পুরো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি ইআরপি (এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং) সিস্টেম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।" শিক্ষকদের পে-স্কেল প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, "প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর নতুন শিক্ষক নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। এতে শিক্ষকদের বিভিন্ন সমস্যা ও দাবির বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। কাজ শেষ হলে অধিদপ্তর প্রতিবেদন দেবে। এরপর মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর তা মন্ত্রিসভায় যাবে এবং অনুমোদিত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।" তিনি বলেন, "নতুন শিক্ষক নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশের কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হতাশ বা নিরাশ হবেন না।"
দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের ভাতা প্রসঙ্গে ববি হাজ্জাজ বলেন, "কোনো উপজেলা বা ইউনিয়নকে দুর্গম ঘোষণা করা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নয়। তবে স্থানীয় প্রশাসন কোনো এলাকা বা বিদ্যালয়কে বাস্তবিক অর্থে দুর্গম মনে করলে এবং প্রমাণসহ সুপারিশ করলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষক ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা দুর্গম ভাতা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।" এর আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফিডিং কর্মসূচির কার্যক্রম নিয়ে পাইকগাছা উপজেলার ১৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে ওরিয়েন্টেশন ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কর্মসূচির বাস্তবায়ন, খাদ্য সরবরাহ, খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা ও তা সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়.