কিশোরগঞ্জ শহরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েশিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ছয় বছর আগে সরকারি উদ্যোগে নির্মিত স্কুল ভবন ও হোস্টেল এখন পর্যন্ত এক দিনের জন্যও চালু হয়নি। জনবল নিয়োগ না হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কিশোরগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জানান, স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত দোতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০১৯ সালে। নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “২০১৯ সালে দোতলা ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।”
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ভবনটি অযত্নে পড়েছে। দেয়ালে শেওলা জমেছে এবং বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ছে। জানালা-দরজা জরাজীর্ণ। গত ৩১ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের ভেতরে চেয়ার-টেবিল, ফ্যান, পানির কল, বৈদ্যুতিক মোটর, স্যানিটারি সামগ্রীসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। ভবনটিতে ১০টি খাট, ১০টি ফ্যান, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার-টেবিল, আলমারি ও ল্যাপ-তোষক, হাঁড়িপাতিলসহ কয়েক লাখ টাকার আসবাব ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনের ভেতরে কিছু বড় ফার্নিচার ছাড়া সবই চুরি হয়ে গেছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০ জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রীর বিনা মূল্যে লেখাপড়া ও থাকা-খাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম (বালিকা) স্কুল ও ছাত্রীনিবাস করা হয়। দোতলা ভবনের ওপরের তলায় ছাত্রীদের জন্য তিনটি কক্ষ রয়েছে। নিচে পাঠদানের তিনটি কক্ষ ও প্রশাসনিক কার্যালয়। স্কুলটি চালু করতে অন্তত একজন শিক্ষক, একজন হাউস প্যারেন্ট (শিক্ষার্থীদের দেখভাল করা কর্মকর্তা), একজন করে অফিস সহায়ক, নিরাপত্তা কর্মী ও বাবুর্চি প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় সমন্বিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম (বালক) স্কুল ও হোস্টেল রয়েছে। সেখানে থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মেয়েদের স্কুলটি চালু হলে অনেকের উপকার হতো। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের আজিম উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোকাররম হোসেন মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “অনেক অভিভাবক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্রী নিয়ে তাঁদের স্কুলেও আসেন। অন্য জায়গার দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি দেখিয়ে এক ছাত্রী তাদের স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। দুই বছর আগে ওই ছাত্রী এসএসসি পাস করে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল ও হোস্টেলটি চালু হলে খুবই ভালো হতো। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এটি চালু করা।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ টি এম আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্কুল ও হোস্টেলের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ হলেই তাঁরা শিক্ষার্থী ভর্তির কাজ শুরু করবেন। স্কুলটি যাতে দ্রুত চালু করা হয়, সে জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।”
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য নির্মিত এই স্কুল ভবনের পাশেই সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)। এই প্রতিষ্ঠানের উপতত্ত্বাবধায়ক আয়েশা রশিদ মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনটিতে বেশ কয়েকবার চুরি হয়েছে। মাদকাসক্ত লোকজন ভবনের ভেতরে আড্ডা দেয়, অনেকে রাতেও থাকে। এসব কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি লিখিতভাবে থানা-পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।”
কিশোরগঞ্জে বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠক কামরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “চোখের সামনে সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে দেখলে খুব কষ্ট লাগে। স্কুলের চেয়ে ভবন নির্মাণেই মনে হয় আগ্রহ বেশি কর্মকর্তাদের। দ্রুত জনবল নিয়োগ দিয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।”