তিউনিশিয়া ও মরক্কোর অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলা হয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে।
তিউনিশিয়া, তুরস্ক, মরক্কোসহ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সিডও সনদে কোনো সংরক্ষণ রাখেনি। এসব দেশের আদলে সিডও সনদে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন পরিবর্তন ও বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদে সম–অধিকারবিষয়ক দুটি ধারার ওপর ৪২ বছরের সংরক্ষণ প্রত্যাহারে বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীদারদের মধ্যে আলোচনা চায় মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এ লক্ষ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে মুসলিম দেশগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়েছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই প্রস্তাবের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের। তবে এ ব্যাপারে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সিডও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পর তা জাতিসংঘে পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে সিডওর দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেই গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে সিডওর নবম ও দশম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। সেই প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নসহ ৪৩৩টি সুপারিশ, তিউনিশিয়া–মরক্কোর আলোকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজনীয়তা ও ধাপে ধাপে সংরক্ষণ প্রত্যাহারে বাংলাদেশের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সিডও প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার পর তা জাতিসংঘে পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আন্তর্জাতিক সনদ সিডওর পূর্ণ নাম হচ্ছে কনভেনশন অন দ্য ইলিমিনেশন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশন এগেইনস্ট উইমেন (নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ)। সিডও সনদের দুটি ধারায় সংরক্ষণ বহাল রেখে দেশে আজ ৩ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক সিডও দিবস।
সিডওর দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হওয়ায় নারীর পারিবারিক অধিকার, বিবাহসংক্রান্ত অধিকার, ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।
নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘে সিডও সনদ গৃহীত হয়। ১৯৮০ সালের ১ মার্চ থেকে বিভিন্ন দেশ সনদটিতে স্বাক্ষর শুরু করে। ১৯৮১ সালের ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এ সনদ কার্যকর হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সিডও সনদ স্বাক্ষর ও অনুমোদন করে। শুরুতে সনদের ২, ১৩(ক), ১৬(১)(গ) ও (চ) ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেছিল বাংলাদেশ। পরে ২ ও ১৬(১)(গ) ধারার ওপর সংরক্ষণ বহাল রেখে বাকি দুটি থেকে তুলে নেওয়া হয়। সনদের ২ নম্বর ধারায় বলা আছে, নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য নিরসনে শরিক দেশগুলো আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবে এবং আইনের সংস্কার করবে। ১৬.১(গ) ধারায় বিবাহ ও পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ে বৈষম্য দূর করতে বিবাহ এবং বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের পাঠানো সিডও প্রতিবেদনে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশের নারী পরিস্থিতি ও পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে নবম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ ছিল। তবে কোভিড ও অন্যান্য বিষয় তুলে ধরে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে নেয় বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে দশম প্রতিবেদন দেওয়ার সময় নির্ধারণ ছিল। গত বছর বাংলাদেশ দুটি প্রতিবেদন একসঙ্গে জমা দিয়েছে।
বিশেষ করে কমিশন বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে, যা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিক হিসেবে থাকবে। সরকার বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করছে।
প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন ও কমিশনের ৪৩৩টি সুপারিশের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন আইনে বৈষম্যমূলক ধারা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে। বিশেষ করে কমিশন বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার বিষয়ে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে, যা সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিক হিসেবে থাকবে। সরকার বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করছে।
নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হককে প্রধান করে গঠিত ১০ সদস্যের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গত বছরের ১৯ এপ্রিল সুপারিশ জমা দেয়।
সংরক্ষণের বিষয়ে সিডও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সাল থেকে ২ ও ১৬(১) ধারার ওপর সংরক্ষণ রেখেছে বাংলাদেশ। তবে নারীর সমতার লক্ষ্যে ধাপে ধাপে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সংরক্ষণ প্রত্যাহারের লক্ষ্যে এগোচ্ছে। গত বছরের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’–এর ৬৯তম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের মহিলা ও শিশুবিষয়ক উপদেষ্টা ও তিউনিয়শিয়ার জেন্ডার ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তিউনিশিয়া মুসলিম দেশ হলেও দেশটি কোনো সংরক্ষণ ছাড়া সিডও সনদ বাস্তবায়ন করছে। দেশটির অভিজ্ঞতার আলোকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সম্ভাব্য কী কী ব্যবস্থা নিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ আরেক মুসলিম দেশ মরক্কোর মতামতও নিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫’ রহিত করে ‘পারিবারিক আদালত আইন ২০২৩’ কার্যকর করা হয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, খোরপোশ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতসংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারিবারিক আদালতকে শক্তিশালী করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৪ জানুয়ারি উচ্চ আদালত যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে মাকে সন্তানের আইনি অভিভাবক হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ফলে সব কাজগপত্রে মা–বাবা দুজনের নাম লেখার বাধ্যবাধকতা নেই, সন্তানের একক অভিভাবক হিসেবে শুধু মায়ের নাম লেখা যাবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সিডওর দুটি ধারার ওপর সংরক্ষণ প্রত্যাহার না হওয়ায় নারীর পারিবারিক অধিকার, বিবাহসংক্রান্ত অধিকার, ব্যক্তিগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এর ফলে একজন নাগরিক হিসেবে নারীর অধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে না। নারীর প্রতি নির্যাতনও কমছে না। বিশেষ করে যৌতুক ও পারিবারিক নির্যাতন কমছে না। তিনি বলেন, এটা ভালো দিক যে সরকার নবম ও দশম পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদনে সংরক্ষণ প্রত্যাহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু গণতান্ত্রিক দেশ, তাই শুধু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মডেল অনুসরণ না করে অসাম্প্রদায়িক চিন্তাভাবনা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহারে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।