সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে’ বলে কান্নাকাটি করা এক প্রসূতি নারী ও পরবর্তীতে তার মৃত নবজাতকের ভিডিও ও ফটোকার্ড ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় বিভিন্ন দাবি-আপত্তি। তবে যাচাই করে জানা যায়, ভিডিওটি বাস্তব হলেও ঘটনাটি বাংলাদেশের কোনো হাসপাতালের নয়। এটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের রেওয়া জেলার সঞ্জয় গান্ধী মেমোরিয়াল হাসপাতালে ঘটে।

ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালের ওয়ার্ডে এক প্রসূতি নারী স্বজনদের কাছে নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। এরপর বিভিন্ন ফটোকার্ড ও থাম্বনেইলে লেখা উঠে আসে, ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে বলার পরেই মা ও নবজাতকের মৃত্যু’ অথবা ‘ওরা আমাকে মেরে ফেলবে—শেষ আকুতির পর মা ও নবজাতকের মৃত্যু’। স্থানের কোনো উল্লেখ না থাকায় অনেক ব্যবহারকারী এটিকে বাংলাদেশের ঘটনা মনে করছেন।

বাস্তবতা হলো, ২৫ বছর বয়সী কল্পনা মিশ্র গত ২৫ আগস্ট রাতে রেওয়া জেলার ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য তিনি সেখানে যান। পরদিন ২৬ আগস্ট রাতে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি সন্তান জন্ম দেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে কল্পনা ও তাঁর নবজাতকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে তাঁকে হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে কান্নাকাটি করতে এবং স্বজনদের কাছে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য আকুতি জানাতে দেখা যায়। হাসপাতাল কর্মীরা তাঁকে সামলানোর চেষ্টা করেন এবং পরে আবার ভেতরে নিয়ে যান।

কল্পনার পরিবারের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বাবা রামশরণ মিশ্র জানান, কল্পনা বারবার চিকিৎসার জন্য আকুতি জানালেও যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পরিবারের দাবি, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর কল্পনা আর জ্ঞান ফিরে পাননি। স্বজনদের সন্দেহ, অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার কারণেও তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে, হাসপাতাল সুপারিনটেনডেন্ট রাহুল মিশ্র চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ নাকচ করে বলেন, কল্পনাকে নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল এবং চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে কোনো অবহেলা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, কল্পনা গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনসংখ্যক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাননি। নির্ধারিত সময়ে অন্তত আটটি পরীক্ষা করার কথা থাকলেও তাঁর নথিতে মাত্র দুটি পরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে। দুটিই একটি বেসরকারি হাসপাতালে করা হয়েছিল।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের চিকিৎসা নথিতে কল্পনার শারীরিক অবস্থার কিছু গুরুতর সমস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা ছিল প্রতি মাইক্রোলিটারে প্রায় ৩০ হাজার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম। তাঁর রক্তচাপও ছিল অত্যন্ত বেশি এবং লিভারের এনজাইমের মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। তবে এসব শারীরিক জটিলতাকে তাঁর মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।

ঘটনার প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দুই চিকিৎসক ও দুই নার্সিং কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক সোনাল আগরওয়াল ও অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের নিধি পান্ডের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অবহেলা ও দায়িত্বে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ পাওয়া যায়। পরিবারের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগের পর দুই নার্সিং কর্মীকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে কারও দায় প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

হাসপাতালের ডিন সুনীল আগরওয়াল ঘটনাটিকে অত্যন্ত মর্মান্তিক হিসেবে উল্লেখ করে জানান, পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত কমিটি খতিয়ে দেখবে। কল্পনা অচেতন হওয়ার পর কেন আর জ্ঞান ফিরে পাননি, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। চিকিৎসায় অবহেলার কারণেই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানা যায়নি। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো প্রতিবেদন না পড়ে শুধুমাত্র ফটোকার্ড বা ক্যাপশন দেখে ধারণা তৈরি করলে বাস্তব ঘটনার স্থানের পরিচয় বাদ দিয়ে প্রচারের কারণে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।