ফ্যাটি লিভার বর্তমান সময়ে একটি সাধারণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অনেকের ধারণা, লিভারে চর্বি জমলে কোনো বিশেষ পানীয় বা ঘরোয়া টোটকা দিয়ে তা দ্রুত দূর করা সম্ভব। তবে চিকিৎসকরা স্পষ্ট করেছেন, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অতিরিক্ত ওজন, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন প্রতিরোধ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং অ্যালকোহল সেবনের মতো কারণে লিভারে চর্বি জমে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যালকোহল ছাড়া বিপাকীয় কারণে হওয়া এই অবস্থাকে বর্তমানে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ (MASLD) নামে অভিহিত করা হয়।

ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক পর্যায়টি প্রায়শই কোনো স্পষ্ট উপসর্গ তৈরি করে না। ফলে অনেকে অন্য কোনো পরীক্ষার সময় এটি আবিষ্কার করেন। তবে জীবনযাত্রায় যথাযথ পরিবর্তন এনে লিভারের চর্বি নিয়ন্ত্রণ ও রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব। এর জন্য ধীরে ওজন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম অপরিহার্য।

ওজন নিয়ন্ত্রণ হলো ফ্যাটি লিভার ব্যবস্থাপনার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গবেষণায় দেখা গেছে, মোট শরীরের ওজনের অন্তত ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি কমে। আর ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানো হলে লিভারের প্রদাহসহ রোগের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য উন্নতি লাভ করে। তবে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা ঝুঁকিপূর্ণ। হেল্থ লাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১ থেকে ২ পাউন্ড বা ০.৫ থেকে ০.৯ কেজি ওজন কমানো নিরাপদ। খুব কম ক্যালোরির খাবার বা দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা রাখার মতো কঠোর পদ্ধতি এড়িয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হলে শুধু এক বা দুটি খাবার বাদ দেওয়া যথেষ্ট নয়। পুরো খাদ্যতালিকা সামঞ্জস্য করতে হবে। মিষ্টি, কোমল পানীয়, চিনিযুক্ত চা-কফি এবং প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয় যতটা সম্ভব কমানো জরুরি। বিশেষ করে ফ্রুক্টোজ বা অতিরিক্ত সাধারণ চিনি থাকা পানীয় ও খাবার সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ফলের প্রাকৃতিক চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত মিষ্টির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; ফ্যাটি লিভার থাকলেও সব ফল বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার, যেমন অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর পরিবর্তে বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডো, মাছ এবং অন্যান্য অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস বেছে নেওয়া ভালো। বাংলাদেশি প্রেক্ষাপটে এর অর্থ হলো, অতিরিক্ত তেলে ভাজার বদলে কম তেলে রান্না করা এবং মাছ, ডাল, শাকসবজি ও বাদামের খপ্তার বাড়ানো।

সাদা ভাত, সাদা পাউরুটি ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করা বেশি খাওয়ার বদলে আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) তথ্য অনুযায়ী, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার, যেমন অধিকাংশ শাকসবজি, কিছু ফল ও পূর্ণ শস্য, রক্তে শর্করার ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে। তাই ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে সঙ্গে বেশি সবজি, ডাল ও প্রোটিন রাখা যেতে পারে। শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ খাদ্যতালিকায় রাখলে পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা থাকে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।

ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ডাল, মসুর ও ছোলা, পরিমিত পূর্ণ শস্য, মাছ, চামড়া ছাড়া মুরগি, ডিম, বাদাম ও বীজ, কম চিনি থাকা বা সম্পূর্ণ ফল, চিনি ছাড়া টক দই এবং স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বির উৎস রাখা যেতে পারে। হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, মাছ এবং স্বাস্থ্যকর চর্বিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশি খাবারের সাথেও মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।

অ্যালকোহল লিভারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভার থাকলে সম্পূর্ণভাবে অ্যালকোহল বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমনকি অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কারণে হওয়া ফ্যাটি লিভারেও অ্যালকোহল কমানো বা এড়িয়ে চলা ভালো। যাদের লিভারের রোগ রয়েছে, তাদের জন্য কতটা অ্যালকোহল নিরাপদ তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শারীরিক পরিশ্রমও ফ্যাটি লিভার কমাতে সাহায্য করে। হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা অন্যান্য অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও করা যেতে পারে। হেল্থ লাইনের প্রতিবেদনে অ্যারোবিক ও রেজিস্ট্যান্স ট্রেনিং দুটিকেই উপকারী বলা হয়েছে। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখতে বলা হয়। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না, তারা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।

ফ্যাটি লিভার কমানোর কোনো জাদুকরি উপায় বা ডিটক্স পানীয় নেই। লিভার নিজেই শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে। ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করা, ওজন ঠিক রাখা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা। ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট, যেমন ভিটামিন ই, নিয়ে গবেষণা চললেও এর উপকার ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত ওষুধ বা কিছু সাপ্লিমেন্টও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে চিকিৎসককে তা জানানো গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু ঘরোয়া উপায় অনুসরণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও ফলোআপ করা উচিত। কারও ক্ষেত্রে লিভারে শুধু চর্বি জমতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও জীবনযাপনের পরিবর্তন ছাড়া থাকলে কিছু মানুষের রোগ আরও গুরুতর হয়ে সিরোসিস বা লিভারের অন্যান্য জটিলতায় এগিয়ে যেতে পারে। তাই ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা না করে রোগের কারণ ও মাত্রা বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

সূত্র: হেল্থ লাইন