সাধারণ পোকামাকড়ের কামড় সামান্য যন্ত্রণাদায়ক হলেও ভিমরুলের আক্রমণ জীবনঘাতী হতে পারে। বিশেষ করে দলবদ্ধভাবে আক্রমণ করলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা না পেলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ব্যক্তিকে একসাথে ২০ বা তার বেশি ভিমরুল কামড়ালে অ্যালার্জির অভাবেও শরীরে বিষক্রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

ভিমরুলের বিষে অ্যাসিটাইলকোলিন, ফসফোলাইপেস, হিস্টামিন, হায়ালুরোনিডেস, প্রোটিয়েস এবং বিভিন্ন এনজাইম থাকে। এর প্রভাব দুইভাবে দেখা দেয়। প্রথমত, কিছু মানুষের শরীর এই বিষের প্রতি তীব্র সংবেদনশীল হয়। এমন ক্ষেত্রে একটি বা দুটি কামড়েই অ্যানাফাইলাক্সিস নামক প্রাণঘাতী অ্যালার্জিক বিক্রিয়া শুরু হতে পারে। এতে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যায়, শ্বাসনালি ফুলে শ্বাসকষ্ট হয় এবং রোগী সংজ্ঞাহীন হয়ে মারা যেতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, একসাথে ২০ বা তার বেশি ভিমরুল কামড়ালে অতিরিক্ত টক্সিনের কারণে শরীরে বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। এই বিষ রক্তের লোহিত কণিকা ভেঙে ফেলে এবং পেশির টিস্যু নষ্ট করে। উৎপন্ন বর্জ্য পদার্থ জমে কিডনি বিকল করে, হৃদ্‌যন্ত্রে সমস্যা তৈরি করে এবং যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মৃত্যু ঘটে। একে মাল্টি-অর্গান ফেইলিউর বলা হয়।

ভিমরুল দল বেঁধে আক্রমণ করলে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমে রোগীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনতে হবে। সাধারণত ভিমরুল মৌমাছির মতো হুল ত্বকে ফুটিয়ে রাখে না, তবে যদি হুল থেকে যায় তবে কার্ড বা চিমটা দিয়ে আলতো করে বের করতে হবে। বিষ বের করার জন্য চাপ দেওয়া যাবে না। হুল ফোটানো স্থানে সঙ্গে সঙ্গে কাপড়ে মোড়া বরফ বা ঠান্ডা পানি ১০ থেকে ১৫ মিনিট চেপে রাখলে বিষের ছড়িয়ে পড়া ধীর হয় এবং ফোলা ও যন্ত্রণা কমে। ক্ষতস্থান ক্ষারযুক্ত সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়। এরপর অবহেলা না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়া উচিত।

হাসপাতালে রোগীর অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অ্যানাফাইলাকটিক শক দেখা দিলে শ্বাসনালি খুলে ও রক্তচাপ স্বাভাবিক করতে এড্রেনালিন ইনজেকশন জীবনরক্ষাকারী প্রথম ওষুধ হিসেবে কাজ করে। ফোলা, প্রদাহ ও অ্যালার্জি কমাতে শিরায় বা মুখে অ্যান্টিহিস্টামিন ও কটিকোস্টেরয়েড দেওয়া হয়। প্রচুর স্যালাইন ফ্লুইড থেরাপির মাধ্যমে রক্ত থেকে টক্সিন বের করার চেষ্টা করা হয়। শ্বাসকষ্ট থাকলে নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয়। অতিরিক্ত কামড়ে কিডনি বিকলের উপক্রম হলে দ্রুত ডায়ালাইসিস বা আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন হয়, যা রক্ত থেকে বিষ ছেঁকে বের করে।

ভিমরুলে আক্রান্ত হলে মুখ, ঠোঁট, জিহ্বা বা গলা হঠাৎ ফুলে গেলে, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস বা শ্বাসকষ্ট হলে, বুকে ধড়ফড় বা মাথা ঘোরালে, শরীরে লাল চাকা ওঠে বা তীব্র চুলকানি হয়, বমি ভাব বা অনবরত বমি হয়, এবং কথা জড়িয়ে যায় বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লে একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে জরুরি সেবা ডাকতে হবে। একবার তীব্র অ্যালার্জি হওয়ার পর আবার আক্রান্ত হলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৩০-৬০ ভাগ বেড়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শে ভেনম ইমিউনোথেরাপি গ্রহণ করলে এই ঝুঁকি ৫ শতাধিক নিচে নেমে আসে। অপচিকিত্সায় সময় নষ্ট না করে সঠিক সময়ে আধুনিক চিকিৎসা নিলেই অমূল্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

লেখক: জুনিয়র কনসালট্যান্ট, ইন্টার্নাল মেডিসিন বিভাগ, স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেড, ঢাকা