সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে ভেজানো কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। রাতে পানিতে কয়েকটি কিশমিশ ভিজিয়ে রেখে সকালে সেই কিশমিশ খাওয়া এবং ভেজানো পানি পান করার চল বেশ পুরোনো। অনেকে মনে করেন, এই অভ্যাস হজমশক্তি বাড়ায়, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়, শরীরে আয়রনের ঘাটতি পূরণ করে এবং ত্বকের জন্যও উপকারী।

নিয়মিত ভেজানো কিশমিশ খেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা আজ নতুন না। তবে কিশমিশের পুষ্টিগুণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকলেও শুধু পানিতে ভিজিয়ে খেলে তার পুষ্টি শরীরে অনেক বেশি শোষিত হয় বা এক মাসেই নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা দূর হয়ে যায়, এমন শক্ত প্রমাণ এখনো নেই।

কিশমিশে কী কী পুষ্টি আছে?

কিশমিশ মূলত শুকনো আঙুর। আঙুর শুকিয়ে গেলে এতে থাকা পানি কমে যায় এবং প্রাকৃতিক চিনি, ক্যালরি ও কিছু পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে বেশি ঘন হয়ে থাকে।

কিশমিশে খাদ্য আঁশ, আয়রন, পটাশিয়ামসহ বিভিন্ন খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এতে প্রাকৃতিক চিনি থাকায় এটি দ্রুত কিছুটা শক্তি দিতে পারে। তবে একই কারণে বেশি পরিমাণে কিশমিশ খাওয়াও ঠিক নয়।

ভেজানো কিশমিশ খেলে কী উপকার হতে পারে?

কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে

কিশমিশে খাদ্য আঁশ রয়েছে। পর্যাপ্ত আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাই খাবারের তালিকায় পরিমিত কিশমিশ রাখা কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।

তবে শুধু ভেজানো কিশমিশ খেলেই দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য সেরে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পর্যাপ্ত পানি পান, শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় একটি অনলাইন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ভেজানো কিশমিশকে প্রাকৃতিক রেচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভেজানো কিশমিশ বা কিশমিশের পানি নিয়ে নির্দিষ্টভাবে করা গবেষণা এখনো সীমিত।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়ার ভালো উপায় হতে পারে

কিশমিশে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

কিশমিশ খাওয়ার পর রক্তে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা বাড়তে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিদিন ভেজানো কিশমিশ খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে।

আয়রন গ্রহণে সহায়তা করতে পারে

কিশমিশে আয়রন রয়েছে। আয়রন শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছাতে সাহায্য করে।

তবে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া থাকলে শুধু কিশমিশ খেয়ে তা ঠিক করার চেষ্টা করা উচিত নয়। অ্যানিমিয়ার কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা ও আয়রনসমৃদ্ধ খাবার বা ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। কিশমিশ থেকে পাওয়া আয়রনের পরিমাণও এমন নয় যে এটি একাই আয়রনের ঘাটতি পূরণ করবে।

পটাশিয়াম পাওয়ার একটি উৎস

কিশমিশে পটাশিয়াম রয়েছে। শরীরে তরল ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য এবং স্বাভাবিক পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্রমে পটাশিয়ামের ভূমিকা রয়েছে।

পটাশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা হিসেবে শুধু ভেজানো কিশমিশের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবার, শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ।

এক মাস প্রতিদিন ভেজানো কিশমিশ খেলে কি নিশ্চিত পরিবর্তন হবে?

এখানেই একটু সতর্ক হওয়া দরকার। এক মাস নিয়মিত ভেজানো কিশমিশ খেলে সবার শরীরে একই ধরনের পরিবর্তন হবে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

কেউ হয়তো নিয়মিত কিশমিশ খাওয়ার কারণে পর্যাপ্ত আঁশ পেয়ে হজমে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন। আবার কারও ক্ষেত্রে তেমন কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নাও হতে পারে। কারণ একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, বয়স, ওজন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্য একেক রকম।

বিশেষ করে ভেজানো কিশমিশের পানি নিয়ে আলাদা করে বড় পরিসরের গবেষণা খুব সীমিত। কিশমিশের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে তথ্য থাকলেও ভিজিয়ে রাখার কারণে সব পুষ্টি শরীরে বেশি ভালোভাবে শোষিত হয়, এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

কীভাবে ভেজানো কিশমিশ খাবেন?

রাতে ৮ থেকে ১০টি কিশমিশ পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে খাওয়া যেতে পারে।

এভাবে খেতে চাইলে কিশমিশ ভালোভাবে পরিষ্কার করে পরিমাণমতো পানিতে ভিজিয়ে রাখতে পারেন। সকালে কিশমিশগুলো খাওয়া যায়। ভেজানো পানি পান করার প্রচলন থাকলেও মনে রাখা দরকার, কিশমিশের পানির আলাদা কোনো প্রমাণিত ডিটক্স উপকারিতা নেই। শরীরের বর্জ্য অপসারণের প্রধান দায়িত্ব লিভার ও কিডনির।

খালি পেটে খেতেই হবে?

ভেজানো কিশমিশ খালি পেটে খেতেই হবে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। সকালে খালি পেটে খেলে কারও ভালো লাগতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে দিনের অন্য সময় খাওয়াই বেশি স্বস্তিদায়ক হতে পারে।

তাই খালি পেটে খাওয়াকে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হলো, মোট খাদ্যতালিকায় কিশমিশ পরিমিতভাবে রাখা।

বেশি কিশমিশ খেলে সমস্যা হতে পারে?

হ্যাঁ। কিশমিশ শুকনো ফল হওয়ায় এতে প্রাকৃতিক চিনি ও ক্যালরি তুলনামূলকভাবে ঘন থাকে। ফলে একসঙ্গে বেশি কিশমিশ খেলে অতিরিক্ত ক্যালরি ও চিনি গ্রহণ হয়ে যেতে পারে।

ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যা থাকলে কিশমিশের পরিমাণের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কিশমিশে আঁশ থাকলেও এটি মিষ্টি খাবারের বিকল্প হিসেবে ইচ্ছেমতো খাওয়া উচিত নয়।

এ ছাড়া কারও কারও ক্ষেত্রে শুকনো ফল বেশি খেলে পেটের অস্বস্তি হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে কিশমিশে অ্যালার্জিও হতে পারে।

কিশমিশ নাকি কিশমিশের পানি?

কিশমিশের পুষ্টিগুণ পেতে চাইলে শুধু ভেজানো পানি পান করার চেয়ে কিশমিশটিও খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কিশমিশের মধ্যে খাদ্য আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে। কিশমিশের পানি নিয়ে স্বাস্থ্য উপকারিতার যেসব দাবি প্রচলিত, সেগুলোর বেশির ভাগের পক্ষে সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত।

তাই সকালে এক গ্লাস কিশমিশের পানি খেলেই শরীর ডিটক্স হবে, হজমশক্তি অনেক বেড়ে যাবে বা দ্রুত ওজন কমবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।

ভেজানো কিশমিশ কোনো জাদুকরি খাবার নয়। তবে পরিমিত পরিমাণে কিশমিশ স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। এতে খাদ্য আঁশ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, আয়রন ও পটাশিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

এক মাস নিয়মিত ভেজানো কিশমিশ খাওয়ার অভ্যাস কারও খাদ্যতালিকায় ভালো একটি পরিবর্তন আনতে পারে, বিশেষ করে যদি এর মাধ্যমে মিষ্টি বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে একটি পুষ্টিকর খাবার যোগ হয়। কিন্তু শুধু এই একটি অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে রক্তস্বল্পতা, উচ্চ রক্তচাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা দূর করার চেষ্টা করা ঠিক নয়।

স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস। পর্যাপ্ত পানি, শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, প্রোটিন, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে পরিমিত কিশমিশ রাখা যেতে পারে দৈনন্দিন খাবারের অংশ হিসেবে।

সূত্র : হিন্দুস্তান টাইমস