মাঠজুড়ে সবুজের হাতছানি। কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও চলছে ধানের চারা রোপণ। আবার উপজেলার বিভিন্ন হাটে সকাল থেকেই চলছে চারা কেনাবেচার হাঁকডাক ও ব্যস্ততা। চলতি মৌসুমে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় রোপা আমন ধানের আবাদে নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। নিয়মিত বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়ায় ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি জমিতে চারা রোপণ শেষ হয়েছে। ভোর থেকেই কৃষকেরা হাটে ছুটছেন; দেখে-শুনে পছন্দের জাত ও মানসম্মত চারা কিনে জমিতে রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে আবাদ বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও কৃষকদের মধ্যে রয়েছে নানা দুশ্চিন্তা। সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, জমি প্রস্তুত ও সেচসহ সার্বিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে কি না—তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন অনেকে। কৃষকদের দাবি, ফলন ভালো হলেও বাজারে ধানের উপযুক্ত দাম না থাকলে বাড়তি উৎপাদনের সুফল তাদের ঘরে পৌঁছাবে না।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মধুখালীতে ৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ৬০ হেক্টর। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ৬২০ হেক্টর বেশি জমিতে আমন চাষের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগাম ও ভাসমান চারা মিলিয়ে এরই মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। ভাদ্র মাস পর্যন্ত রোপণের সুযোগ থাকায় এবং নিয়মিত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলার প্রধান দুটি বাজার—মধুখালী সদর ও কামারখালী হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকেই কৃষক ও চারা বিক্রেতাদের ভিড়। বিভিন্ন জাতের চারা নিয়ে হাটে বসেছেন বিক্রেতারা। কৃষকেরা চারা যাচাই-বাছাই করে নিজেদের জমি ও পছন্দ অনুযায়ী জাত কিনছেন। মধুখালী হাটে প্রতি বোঝা চারা ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে বোঝাপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত খাজনা আদায় করা হচ্ছে। ফলে চারা, পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে আমন আবাদ শুরুর আগেই কৃষকের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ পড়তে শুরু করেছে।
চারা বিক্রেতা সামাদ শেখ বলেন, "বাজারে এবার চারার সরবরাহ ভালো। বিভিন্ন জাতের চারা পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকরা ভালো ও শক্ত দেখে নিজেদের পছন্দমতো চারা কিনছেন।"
অন্যদিকে কামারখালী বাজারের খাজনা আদায়কারী মো. ইমন শেখ বলেন, "সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাটে চারা কেনাবেচা চলছে। এবার কৃষকেরা অপেক্ষাকৃত ভালো মানের চারার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।"
তবে কয়েকজন কৃষক জানান, আমন চাষে এবার তাদের খরচ আগের তুলনায় বেড়েছে। জমি প্রস্তুত, চারা কেনা, রোপণ শ্রমিকের মজুরি, সার ও কীটনাশক—সবকিছুর দামই বাড়তি। বিশেষ করে রোপণের সময়ে শ্রমিকের সংকট দেখা দিলে মজুরি আরও বেড়ে যায়। ফলে ভালো ফলন হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদন খরচ তুলে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়বে। কৃষকদের ভাষ্য, বর্তমানে ধান চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ফসল ঘরে তোলার পর ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা। তাই সার ও কৃষি উপকরণের দাম সহনীয় রাখা, সময়মতো সার-বীজ সরবরাহ এবং ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহাবুব ইলাহী বলেন, "ব্রি ধান১০৭, ব্রি ধান৮৭, বিনা ধান-১৭ সহ বিভিন্ন জাতের আমন ধানের চারা জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রোপণ করা হয়। ইতোমধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে রোপণ শেষ হয়েছে। ভাদ্র মাস পর্যন্ত রোপণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত বৃষ্টিপাত হওয়ায় এবার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।"
তিনি আরও জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে এবার মধুখালীতে আমনের ভালো ফলন হতে পারে। এতে একদিকে যেমন খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে কৃষকের মুখেও হাসি ফুটবে। তবে সেই হাসি ধরে রাখতে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।