বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের মৌখিক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, গত সরকারের আমলে বাপেক্সকে দুর্বল করার ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভরতা দূর করতে বর্তমান সরকার একটি বহুমাত্রিক ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিকে শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচির আওতায় ৩০টি কূপ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে, যা জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত করেছে। আরও ৭টি কূপের কাজ চলমান থাকায় শেষ হলে গ্রিডে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস যোগ হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গ কিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাপেক্সের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দুটি আধুনিক রিগ ক্রয়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসি (প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্যাক্ট)-এর আওতায় ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর আন্তর্জাতিক বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদন প্রক্রিয়াও শেষ ধাপে আছে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যা থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু হবে। এর ফলে আগামী দুই বছরে এলএনজি আমদানি ক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল কিংবা পায়রা ও মোংলা বন্দর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে আরও এক থেকে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী নবায়নযোগ্য শক্তি প্রসারে নেওয়া ঐতিহাসিক পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। ২০২৬ সালের ৮ জুন প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারিসহ সব প্রয়োজনীয় উপাদানের ওপর কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর ও অতিরিক্ত অগ্রীম আয়করসহ সকল শুল্ক সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে। রুফটপ সোলার স্থাপনকারীদের জন্য আকর্ষণীয় আর্থিক মডেল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের ছাদে সোলার স্থাপনকারীদের উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনে নেবে। বর্তমান উৎপাদন খরচ প্রতি ইউনিট ৬ থেকে ৭ টাকার বিপরীতে এই বাল্ক রেট ও প্রণোদনায় উদ্যোক্তারা পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত (৪০ শতাংশ মুনাফা ও ৫ শতাংশ প্রিমিয়াম) নিট মুনাফা অর্জন করতে পারবেন।

সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে সোলার প্যানেল স্থাপনের লক্ষ্যে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সকল জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং অন্যান্য সরকারি দপ্তরে বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সোলারের পাশাপাশি বায়ু বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পরিকল্পনাও এগিয়ে চলছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহতকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি প্রসার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিনের অপর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও আমদানিনির্ভরতা দূর করে দেশকে স্বনির্ভর ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একাধিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে।