পাইলস বা অর্শজনিত সমস্যায় মলত্যাগের সময় ব্যথা, জ্বালাপোড়া ও রক্তপাত সাধারণ। কোষ্ঠকাঠিন্য ও শক্ত মল এই বেদনা আরও তীব্র করে তোলে। তাই ওষুধের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অপরিহার্য।

পাইলস বা হেমোরয়েড হলো মলদ্বার ও নিচের মলাশয়ের আশেপাশের শিরা প্রদাহ ও ফুলে যাওয়া। দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসা, অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, কম ফাইবারযুক্ত খাবার এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এর ঝুঁকি বাড়ায়। মল নরম রাখতে ফাইবার ও পর্যাপ্ত তরল অপরিহার্য। শক্ত মল ত্যাগ করতে চাপ দিলে পাইলসের উপসর্গ তীব্র হয়।

খাদ্যতালিকায় এমন উপাদান কমানো উচিত যা কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি বাড়ায়। প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস, ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, হিমায়িত রেডিমেড খাবার ও ময়দাজাত দ্রব্যে ফাইবার কম থাকে। এগুলো বাদ দিয়ে আটার রুটি, ওটস, লাল বা ঢেঁকি ছাঁটা চাল ও পূর্ণ শস্য গ্রহণ করা ভালো। সসেজ, হটডগ ও প্রক্রিয়াজাত মাংসে ফাইবার নেই, তাই মাংসের পাশাপাশি সবজি, ডাল ও পূর্ণ শস্য রাখতে হবে। চিজ, মাখন ও উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার কারও ক্ষেত্রে পেটের সমস্যা তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত ঝাল বা মশলাদার খাবার মলত্যাগে জ্বালা বাড়ালেও বৈজ্ঞানিকভাবে এটি পাইলসের সরাসরি কারণ নয়; কেবল অস্বস্তি বাড়লে পরিমাণ কমানো যাবে। চা-কফির অতিরিক্ত ক্যাফেইন পানীয় গ্রহণের ধরন বদলাতে পারে, তাই মোট তরল গ্রহণে সতর্ক থাকা জরুরি। অ্যালকোহল ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বাড়ায়, তাই এড়িয়ে চলা বা সীমিত রাখা শ্রেয়। লাল মাংস সম্পূর্ণ বন্ধ করার কোনো বিধান নেই, তবে ফাইবারহীন মাংসের পরিমাণ বেশি ও শাকসবজি কম হলে কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।

মল নরম রাখতে ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার গুরুত্বপূর্ণ। শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, ওটস, পূর্ণ শস্য, মিষ্টি আলু, আপেল, নাশপাতি, বেরি, বাদাম ও বীজ খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউটের (NIDDK) তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণভাবে বয়স ও লিঙ্গভেদে প্রতিদিন প্রায় ২২ থেকে ৩৪ গ্রাম ফাইবার প্রয়োজন হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাসে হঠাৎ অনেক বেশি ফাইবার যোগ না করে ধীরে ধীরে বাড়ানো ভালো। ইসবগুল বা psyllium একটি ফাইবার সাপ্লিমেন্ট যা মল নরম রাখতে ব্যবহার করা যেতে পারে। NIDDK-ও পাইলসের চিকিৎসায় ফাইবার সাপ্লিমেন্ট হিসেবে psyllium-এর কথা উল্লেখ করেছে। তবে ইসবগুল খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত তরল পান করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারও বিশেষ স্বাস্থ্য সমস্যা বা নিয়মিত ওষুধ থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নেওয়া ভালো।

শুধু ফাইবার বাড়ালেই হবে না, পর্যাপ্ত তরলও দরকার। পানি ও অন্যান্য তরল ফাইবারকে কাজ করতে সাহায্য করে এবং মল নরম রাখতে সহায়তা করে। তবে সবার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট ৩ বা ৪ লিটার পানি প্রয়োজন, এমন নিয়ম নেই। শরীরের আকার, আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে। কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র বা অন্য কোনো সমস্যার কারণে যদি চিকিৎসক পানির পরিমাণ সীমিত রাখতে বলে থাকেন, তাহলে সেই পরামর্শই অনুসরণ করতে হবে।

মলত্যাগের অভ্যাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না। টয়লেটে দীর্ঘ সময় বসে থাকবেন না। মোবাইল নিয়ে টয়লেটে বসে থাকার অভ্যাসও এড়িয়ে চলা ভালো। শরীরচর্চা করুন। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। মলত্যাগের বেগ চেপে রাখবেন না। নিয়মিত বেগ চেপে রাখলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা বাড়তে পারে। সিটজ বাথ কি করা যায়? পাইলসের কারণে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে উষ্ণ পানিতে কিছুক্ষণ বসে থাকা, যাকে সিটজ বাথ বলা হয়, সাময়িক আরাম দিতে পারে। NIDDK পাইলসের উপসর্গ কমাতে দিনে কয়েকবার উষ্ণ পানিতে বসার কথা উল্লেখ করেছে। তবে পানিতে নিজের মতো করে লবণ, জীবাণুনাশক বা অন্য কোনো রাসায়নিক মেশানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে কোনো ক্ষত থাকলে কী ব্যবহার করা নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

রক্তপাত হলেই কি পাইলস? না। মলদ্বার দিয়ে রক্ত পড়া পাইলসের একটি সাধারণ লক্ষণ হলেও সব ধরনের মলদ্বার রক্তপাতকে পাইলস ধরে নেওয়া ঠিক নয়। অন্য কারণেও এমন হতে পারে। বিশেষ করে বারবার রক্তপাত হলে, রক্তপাত বেশি হলে, তীব্র ব্যথা থাকলে বা পেটব্যথা, জ্বর কিংবা ডায়রিয়ার সঙ্গে রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। ডায়াবেটিস, পরিপাকতন্ত্র ও কিডনি রোগ বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট এ ধরনের গুরুতর লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

পাইলস হলে একটি সহজ খাদ্যতালিকা কেমন হতে পারে? সকালে ওটস বা আটার রুটি, সঙ্গে ফল রাখা যেতে পারে। দুপুরে ভাত বা রুটি, ডাল, পর্যাপ্ত সবজি এবং মাছ বা মাংসের পরিমিত অংশ রাখা যেতে পারে। বিকেলে ফল, বাদাম বা অন্য কোনো ফাইবারসমৃদ্ধ হালকা খাবার খাওয়া যেতে পারে। রাতে অতিরিক্ত ভারী খাবারের বদলে ভাত বা রুটি, সবজি, ডাল ও পরিমিত প্রোটিন রাখা ভালো। সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। খাবারের পরিমাণ ও ধরন অবশ্যই ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার ওপর নির্ভর করবে।

পাইলস হলে খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা, যাতে কোষ্ঠকাঠিন্য না হয় এবং মল সহজে বের হয়। কম ফাইবারযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও নিজের ক্ষেত্রে অস্বস্তি বাড়ায় এমন খাবার কমানো যেতে পারে। অন্যদিকে শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো উপকারী। তবে পাইলসের জন্য সব ঝাল খাবার, লাল মাংস বা চা-কফি সবার ক্ষেত্রে একেবারে নিষিদ্ধ, এমন নয়। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মল নরম রাখা, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করা এবং মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। আর মলদ্বার দিয়ে অতিরিক্ত বা বারবার রক্তপাত, তীব্র ব্যথা কিংবা অন্য অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে শুধু খাবার পরিবর্তন করে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা