ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিয়ে না করে ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগে ভ্যানচালক রবিউল ইসলাম রবির (২৬) বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী। আদালতের নির্দেশে মামলাটি নথিভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ রবিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। তবে এই ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের দাবির মধ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা দিয়েছে। আসামিপক্ষের দাবি, পরিবারের সম্মতিতে ধর্মীয় রীতি মেনে তাদের বিয়ে হয়েছিল, যার প্রমাণ হিসেবে একাধিক ছবি রয়েছে। অন্যদিকে, বাদীর পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের কোনো কাবিননামা দেওয়া হয়নি এবং নির্যাতনের পর মেয়েটিকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি কালীগঞ্জ উপজেলার ৯ নম্বর বারোবাজার ইউনিয়নের লুচিয়া গ্রামের। গ্রেপ্তারকৃত রবিউল ইসলাম রবি ওই গ্রামেরই resident এবং শুকুর আলীর ছেলে। তিনি ভ্যান চালানোর পাশাপাশি বাজারে ফলের শরবত বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ের সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে রবির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাদীর অভিযোগ, গত বছরের ২৫ আগস্ট বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে কালীগঞ্জের একটি ভাড়া বাসায় তাকে নিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে রবির বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে থাকাকালীন কাবিননামা ও বিয়ের কাগজপত্র চাইলে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাদী কিশোরী ঝিনাইদহ আদালতে মামলা করলে আদালত সেটি কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়। গত ২৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ১টার দিকে বারোবাজার পুলিশ ক্যাম্পের একটি দল লুচিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে রবিকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে তাকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

তদন্তে বাদীর বয়স নিয়ে অস্পষ্টতা সামনে এসেছে। জন্মনিবন্ধনে তার বয়স ১৫ বছর ১ মাস উল্লেখ থাকলেও এজাহারে তা ১৪ বছর বলা হয়েছে। বাদী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় এই কথিত বিয়ের আইনি বৈধতা এখন বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।

রবির বাবা শুকুর আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "আমার ছেলের সঙ্গে ওই মেয়ের ফেসবুকে পরিচয়ের পর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে তার ছেলে কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে ওই মেয়ের বাবার বাড়িতে একাধিকবার যাতায়াত করে এবং বিষয়টি মেয়ের পরিবারের সদস্যরাও জানতেন। তার দাবি, পরে মেয়ের বাবা ও আত্মীয়স্বজন বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তাদের বাড়িতে আসেন। উভয় পরিবারের সম্মতিতে ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ওই মেয়ের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন করা হয়।"

তিনি আরও জানান, মেয়ের বয়স কম হওয়ায় আইনি জটিলতার কথা ভেবে কাবিননামা করা হয়নি, তবে স্থানীয় এক ধর্মীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রায় ১৬ মাস তারা সংসার করেছেন। শুকুর আলীর দাবি, "আমার ছেলের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মামলা করা হয়েছে বলে আমরা মনে করি। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।"

রবির বন্ধু রনি জানান, ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৫০ জন বরযাত্রী নিয়ে তারা কুমড়াবাড়িয়া গ্রামে গিয়েছিলেন। বয়স কম হওয়ায় বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে কাবিন করার কথা ছিল। প্রতিবেশী আব্দুল্লাহ ও লুচিয়া গ্রামের গৃহবধূ পারভীনা বেগমও দুই পরিবারের সুসম্পর্ক এবং বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেছেন। পারভীনা বেগমের দাবি, শাশুড়ির সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর নানি এসে মেয়েটিকে নিয়ে যান, তারা ভেবেছিলেন সে আবার ফিরে আসবে।

অন্যদিকে, আবুল কাশেমের বড় বোন জানান, তাদের এলাকায় এবং রবির বাড়িতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হলেও কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। তার দাবি, রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ায় এবং পরবর্তীতে নির্যাতনের পর তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, "রবিউল ইসলাম রবি তার ছোট বোনকে ফুসলিয়ে সম্পর্কে জড়ায়। পরবর্তীতে রবির পরিবারের সদস্যরা তার ওপর নির্যাতন চালিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। পরে জানিয়েছে, তারা আর আমার বোনকে নেবে না। এজন্যই আমরা আদালতে মামলা করেছি। এখন যেটা হওয়ার, আদালতের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হবে।"

ঘটনার বিষয়ে বাদী কিশোরী জানান, "এটি পারিবারিক বিষয়। আমি বিষয়টি মিডিয়ায় আনতে চাই না। আমরা এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।"

কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানো হয়েছে। বাদীর বয়স অপ্রাপ্ত হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।