জ্বালানিসংকট অব্যাহত থাকলে দেশে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। তাই নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ খোঁজার আগে বিদ্যমান শিল্প ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের আয়োজিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ: প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসার পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতারা সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন। বক্তারা বলেন, জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সরকার উৎপাদনমুখী শিল্পের পরিবর্তে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবা খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দিতে পারে।
আজ রোববার রাজধানীর গুলশানের পুলিশ প্লাজায় এমসিসিআইয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এ আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ফারুক আহমেদ।
.মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান বলেন, বর্তমানে দেশে দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে গড়ে ২৪২ কোটি ঘনফুট। ফলে শিল্প, আবাসন ও অন্যান্য খাত মোট চাহিদার তুলনায় ৪২ শতাংশ কম গ্যাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে পিক আওয়ারে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। এতে শিল্পকারখানার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
হাসিব হাসান আরও জানান, টানা তিন বছর ধরে চলা জ্বালানিসংকট উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে কমে ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ জানান, জ্বালানিসংকটের কারণে হবিগঞ্জ ও নরসিংদীতে তাঁদের শিল্পপার্কগুলোতে এখন উৎপাদন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, সিমেন্ট বা স্টিলের মতো যেকোনো উচ্চ জ্বালানি ব্যবহারকারী শিল্পে জ্বালানিই হলো কাঁচামাল। এটি যখন থাকে না, তখন উৎপাদনও থাকে না—এটাই মূল কথা।
.বর্তমান শিল্পগুলোকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সে পথ খুঁজে বের করতে হবে। সেটিই ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। জ্বালানিসংকট সমাধানে ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এফবিসিসিআই সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করবে।ফজলুল হক, প্রশাসক, এফবিসিসিআই
লাফার্জহোলসিম সিমেন্টের সিইও বলেন, ‘আমরা নতুন বিনিয়োগ নিয়ে অনেক সভা-সেমিনার করছি। আমার বিনীত অনুরোধ, দয়া করে আগে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের বাঁচান। তাঁদের জ্বালানি সরবরাহ করুন। তারপর নতুন বিনিয়োগকারীদের ডাকুন।’
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী আরও জানান, দেশে একমাত্র তাঁদের প্রতিষ্ঠানই ক্লিংকার উৎপাদন করে। একসময় আমদানি করা ক্লিংকারের তুলনায় দেশে উৎপাদিত ক্লিংকারের দাম অনেক কম। কিন্তু গ্যাসের দাম দেড় শ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সংকটের কারণে এখন আমদানি করা ক্লিংকার তুলনামূলক সস্তা হয়ে পড়েছে। তিনি প্রশ্ন করেন, আমদানি সস্তা হলে দেশে কেন অর্ধ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ক্লিংকার উৎপাদন করা হবে? তাঁর ভাষায়, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু সংবাদপত্রের খবর দেখেন না, তাঁরা সরাসরি খোঁজও নেন। তাই শুধু জ্বালানি নিশ্চিত করলেই হবে না, সেটি টেকসই এবং সাশ্রয়ীও হতে হবে।
.দেশের শিল্পায়ন অনেকাংশে সস্তা গ্যাসের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। তাৎক্ষণিকভাবে ৯০-৯৫% সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে জোর দিতে হবে।ইজাজ হোসেন, সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট
বাংলাদেশ সিরামিক উৎপাদন ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মঈনুল ইসলাম বলেন, একসময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে। সেই আশ্বাসে অনেক উদ্যোক্তা সিরামিক কারখানায় বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন তাঁরা দেখছেন গ্যাসের তীব্র সংকট। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা জানি না, কত দিন টিকে থাকতে পারব।’ তিনি জানান, গ্যাস তাঁদের প্রধান কাঁচামাল, এটি ছাড়া উৎপাদন সম্ভব নয়। কিন্তু এ বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে যাঁরা শিল্পের গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছেন, তাঁদেরকে একটি মহল সরকারের উচ্চপর্যায়ে শত্রু হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগ করেন বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। তিনি বলেন, ‘আমরা তো সমাধান চাই। দোষারোপ করা বন্ধ করুন। আজকের সমস্যাকে রাজনীতিকরণ করবেন না।’
শওকত আজিজ রাসেল আরও বলেন, বর্তমানে এলএনজির দাম বেশি থাকায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে যাওয়ার পরিবর্তে স্পট মার্কেট থেকে কেনাই বেশি যৌক্তিক হবে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দিতে হবে।
.বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, বিদ্যুতের জোগান নিশ্চিত না করেই অপরিকল্পিতভাবে চাহিদা তৈরি করা হয়েছে। ফলে সংকট আরও তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের শিল্পায়ন অনেকাংশে সস্তা গ্যাসের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। তাৎক্ষণিকভাবে ৯০-৯৫% সক্ষমতায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে জোর দিতে হবে।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ‘সবাই এখন তাৎক্ষণিক সমাধানই খুঁজছে। কারণ, আমি যদি আজ টিকে থাকতে না পারি, তবে ১০ বছর পর কী হবে, তা আমার জানার দরকার নেই। এটিই হচ্ছে কঠিন সত্য।’
ফজলুল হক আরও বলেন, বর্তমান শিল্পগুলোকে কীভাবে টিকিয়ে রাখা যায়, সে পথ খুঁজে বের করতে হবে। সেটিই ভবিষ্যতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। জ্বালানিসংকট সমাধানে ব্যবসায়ী নেতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এফবিসিসিআই সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করবে। আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকার সংকট সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, ইস্টার্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ শাহীন, ইডকলের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা নাজমুল হক প্রমুখ।