যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধের জেরে অর্থনৈতিকভাবে ইরানের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন দেশটির নেতারা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেছে।

গতকাল শনিবার এ তথ্য জানানো হয়। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না। কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কথাও জানিয়েছে ইরান।

ইরান সরকার বলেছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এখন তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ধীরে ধীরে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়গুলোও আছে।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের বন্দরগুলোয় অবরোধের কারণে দেশটির রপ্তানি ও আমদানি প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে।

তবে পেজেশকিয়ান বলেন, জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার পর সাময়িকভাবে তেল বিক্রির অনুমতি পাওয়া গেলে ইরান প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করতে পেরেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পর থেকে তাঁর ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তিনি এখন সরকারকে অর্থনৈতিক দুর্ভোগ মোকাবিলায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

খামেনির নামে দেওয়া লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, পণ্যের দাম ও পণ্য ও সেবার বাজার ব্যবস্থাপনার মতো অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।’

গত মাসে ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। যুদ্ধের কারণে দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন তেহরানের বাসিন্দারা।

তেহরানের বাসিন্দা মরিয়ম বলেন, ‘যুদ্ধের আগে আমি কাজ করতাম না। যুদ্ধ শুরুর পর সংসারের প্রয়োজনে আমাকে কাজ খুঁজে নিতে হয়েছে। সবকিছুর দাম অনেক বেড়ে গেছে।’

খাদ্য ব্যবসায়ী ওমিদ বলেন, ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘কর্মীদের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের প্রায় নেই বললেই চলে।’

ইরান সরকার শতকাল বিবৃতিতে বলেছে, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার বলেছে, এই দুটি বিষয় পরস্পরের পরিপূরক, অবিচ্ছেদ্য। দেশটি ভারসাম্য বজায় রেখে একই সঙ্গে এই দুই পথ অনুসরণ করবে বলেও জানানো হয়েছে।

তেহরান থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক সিনেম কোসেওগলু বলেন, ইরান সরকার এখন জাতীয় ঐক্যে জোর দিচ্ছে।

সিনেম বলেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপের মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো দেশই অন্য কোনো দেশের ওপর কর্তৃত্ব করে না। অন্যদিকে সর্বোচ্চ নেতা দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও সামাজিক সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানি তেহরানে ইরানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। হরমুজ প্রণালিতে আবার অবাধে জাহাজ চলাচল চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই বৈঠককে ‘সৃজনশীল’ আখ্যা দিয়েছেন।

এদিকে ইরানের সামরিক বাহিনী কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতামি ফারস নিউজ এজেন্সিকে বলেন, ‘শত্রুপক্ষ’ ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের চেষ্টা করলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইরানের মজুত অস্ত্র সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করা হয়েছে।

শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাজিদ ইবনে রেজা বলেন, ‘ইরানের হাতে এখনো “চমক” আছে, সব শেষ হয়ে যায়নি। তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে তিনি আরও বলেন, ‘সবাই, বিশেষ করে শত্রুদের জানা উচিত—সময়মতো তারা ইরানের সেই চমক সম্পর্কে জানতে পারবে।’