আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও শক্তি সাশ্রয়ের চাহিদায় দেশের আবাসন খাতে কাচের ব্যবহার অভূতপূর্বভাবে বেড়েছে। কংক্রিটের দেয়ালের বিকল্প হিসেবে কাচের পার্টিশন বা আসবাবের নকশায় এর সংযোজন কেবল ঘরকে আলোকিতই করছে না, বরং প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে শক্তির অপচয়ও কমিয়ে আনছে। নগরজীবনের চাহিদা ও গ্রিন বিল্ডিং সুবিধার কারণে অন্দরসজ্জা ও বহিরাঙ্গনের নকশায় কাচের বহুমুখী প্রয়োগ এখন একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক ধারা।

আবাসন উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্যভুক্ত ৯২৪ জনসহ দেশে আড়াই হাজারের বেশি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সাম্প্রতিক প্রকল্প ও ভেন্ডর বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবাসনশিল্পের ২৬৯টি ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ খাতের মধ্যে কাচশিল্প অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল। গত কয়েক বছরে ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, বসুন্ধরা এবং অন্যান্য প্রধান শহরের অভিজাত এলাকায় অ্যাপার্টমেন্ট নকশায় নিরাপত্তা কাচ (টেম্পার্ড গ্লাস) ও সাউন্ডপ্রুফ গ্লাস (ডাবল গ্লেজড ইনসুলেটেড গ্লাস) ব্যবহার মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। মোট গ্লাস চাহিদার প্রায় ৪৫ শতাংশ দখল করে আছে নিরাপত্তা টেম্পার্ড গ্লাস, আর প্রায় ২০ শতাংশ সাউন্ডপ্রুফ ও বিশেষায়িত কাচের।

ছোট ফ্ল্যাটে দৃশ্যমান বাধা তৈরি না করে ঘর আলাদা করতে টেম্পার্ড গ্লাস পার্টিশন ও স্লাইডিং ডোরের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ডাইনিং টেবিল, ক্যাবিনেট ডোর ও কফি টেবিলে রঙিন কাচ (লেকার কোটেড গ্লাস) ব্যবহারের পাশাপাশি ছোট ঘরকে বড় দেখাতে বড় আকৃতির ডেকোরেটিভ আয়না যুক্ত করা হচ্ছে। বাথরুমে শাওয়ার এনক্লোজার এবং রান্নাঘরের ব্যাকস্প্ল্যাশে ফ্রস্টেড বা কালারড গ্লাস দেয়ালকে তেল-ময়লা থেকে রক্ষা করে পরিষ্কারের কাজ সহজ করছে। ডাবল গ্লেজড বা ইনসুলেটেড গ্লাস বাইরের কোলাহল কমিয়ে ঘরের ভেতর সহনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে। মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে শব্দদূষণ কমাতে ডেভেলপাররা ডাবল গ্লেজড ইনসুলেটেড গ্লাস ব্যবহার করে শব্দের মাত্রা ৩০ থেকে ৪০ ডেসিবল পর্যন্ত কমিয়ে আনছেন। দুটি কাচের স্তরের মধ্যে এয়ার গ্যাপ বা আর্গন গ্যাস ফিলিং থাকায় এটি বাইরের ট্রাফিক ও তীব্র শব্দ ঘরে ঢুকতে বাধা দেয়। এছাড়া এটি তাপ নিরোধক হিসেবে কাজ করে, ফলে এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের খরচ ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমায়।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং আধুনিক স্থাপত্য নিরাপত্তার নিয়ম মেনে ডেভেলপাররা উচ্চ মানের নিরাপত্তা কাচ ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন। সাধারণ ফ্লোট কাচের চেয়ে টেম্পার্ড কাচ ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি শক্তিশালী। এটি ভাঙলেও ধারালো টুকরা না হয়ে ছোট গোল দানায় পরিণত হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি হ্রাস করে। আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের উন্মুক্ত বারান্দা, রুফটপ গার্ডেন ফেন্সিং, মেজানাইন ফ্লোর রেলিং এবং শাওয়ার এনক্লোজারে ১০ মিমি থেকে ১২ মিমি পুরুত্বের টেম্পার্ড গ্লাস ব্যবহৃত হচ্ছে।

আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কাচের সহজলভ্যতা এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে জোর দিচ্ছে দেশি কোম্পানিগুলো। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন বাড়ছে। দেশীয় কোম্পানি নাসির ফ্লোট গ্লাসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান উচ্চ প্রযুক্তির টেম্পারিং ও ইনসুলেটেড গ্লাস প্ল্যান্টের সক্ষমতা আরও উন্নয়নে উদ্যোগী হয়েছে। কাচশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সহনীয় রাখা, যাতে আবাসনের নির্মাণ খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। পাশাপাশি প্রতিটি বহুতল ভবনে মানসম্মত সেফটি গ্লাস ব্যবহারের বাধ্যতামূলক তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।