কারিগরি কমিটি দ্বিগুণ ব্যয় যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছে। ডিএমটিসিএল প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

.

ঢাকার দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণের বেশি। শুরুতে প্রকল্প দুটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এখন ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার নতুন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। বাড়তি ব্যয়ের এই প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়।

এর একটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে মেট্রোরেল নির্মাণ। প্রকল্পটির (এমআরটি লাইন-১) কাজ চলমান। এর একটি অংশ উড়ালপথে নর্দ্দা থেকে পূর্বাচলে যাবে, অর্থাৎ এটি পাতাল ও উড়াল সমন্বয়ে নির্মাণ করা হবে। অন্যদিকে সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি হচ্ছে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। এটিও পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে নির্মিত হবে।

.
মেট্রোরেল দরকার। নতুবা ঢাকা বাঁচানো যাবে না।
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
.

ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ সংস্থার সূত্র বলছে, বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিভিন্ন কারিগরি পরিবর্তনের কারণে দুটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে।

মেট্রোরেলের লাইন-১ ও লাইন–৫ (উত্তর) প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৯ সালে। ডিপো উন্নয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে। ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন (আরডিপিপি) করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ডিএমটিসিএল। আজ পরিকল্পনা কমিশনে দুটি প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন বৈঠক হওয়ার কথা। বাড়তি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনার পর আরডিপিপি অনুমোদন দেওয়া হবে।

.

মেট্রোরেলের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা। বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই সামনে আসে। ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আর এগোয়নি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে জাইকার সঙ্গে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে। গত ২৪ মে বিএনপি সরকার প্রকল্পের ব্যয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে। গত জুলাইয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

.রাতে মেট্রোরেল আরও বেশিক্ষণ চালানোর ভাবনা, কবে হতে পারে.

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কারিগরি কমিটি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয়ের বিষয়টি যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছে। এরপরই ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে।

বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি যৌক্তিক বলে দাবি করেন শামীম জেড বসুনিয়া। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ, ডলারের মূল্য বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, নকশায় পরিবর্তনের কারণে কাজ বেড়েছে। এর বাইরে সরকারের ভ্যাট ও কর বেড়েছে। ঢাকার জন্য মেট্রোরেল দরকার। ব্যয় বেশি মনে হলে সরকার অন্য ঋণদাতা খুঁজতে পারে। তবে সময় যত যাবে, ব্যয় বাড়বে।

.
মেট্রোরেলের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা। বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই সামনে আসে। ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আর এগোয়নি। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে জাইকার সঙ্গে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে।
.

ব্যয়বহুল মেট্রোরেল

উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রোরেল চলাচল করছে। এর সম্প্রসারিত অংশ যাবে কমলাপুর পর্যন্ত। এই অংশের কাজ চলছে। এ পুরো পথে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে; কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে।

.
দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না আনতে পারলে ব্যয় কমবে না। সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থাকে বুঝিয়ে শর্ত শিথিল করতে পারে, তাহলে ব্যয় এমনিতেই কমে যাবে। এটি পানির মতো পরিষ্কার। টাকার অবমূল্যায়ন, নকশায় পরিবর্তন, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে। আকাশচুম্বী হওয়ার সুযোগ নেই।
বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক
.

লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটিতে দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে প্রথম ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল। তখন বিস্তারিত নকশা হয়নি। পরে বিস্তারিত নকশা করার সময় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। সিমেন্ট, ইস্পাত, জ্বালানি, বিটুমিন, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন। ২০১৯ সালে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হয়েছিল। ২০২৫ সালের হিসাবে তা প্রায় ১২২ টাকা ধরা হয়েছে, অর্থাৎ বিদেশ থেকে কেনা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর টাকায় দাম অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া কর, ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদ ও বিভিন্ন ধরনের আপৎকালীন ব্যয় যুক্ত করে নতুন ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে।

সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মেট্রোরেল দরকার। নতুবা ঢাকা বাঁচানো যাবে না। বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমে যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, তখন পূর্ণাঙ্গ নকশা হয়নি। আর পূর্ণাঙ্গ নকশা বিএনপি সরকারের আগেই হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ নকশা আগে না হলে কিছু খরচে কাটছাঁট করা যেত। এখন বাড়তি ব্যয়ে মেট্রোরেল না করলে ভবিষ্যতে আরও বাড়বে।

.ঢাকা মহানগরীতে ৮টি মেট্রোরেল, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ২১ পরিবহন হাবের পরিকল্পনা.

প্রতিযোগিতার অভাবে ব্যয় বৃদ্ধি

২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হতে যাচ্ছে।

লাইন-১–এর অধীন উড়াল ও পাতাল পথে ৩১ কিলোমিটারের বেশি মেট্রোরেল পথ ও ২১টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। বাড়তি ব্যয় অনুমোদন পেলে এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেলের পেছনে ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।

লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে এ পথের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার। স্টেশন হবে ১৪টি। পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার। এতে মূল ব্যয়ের তুলনায় বাড়ছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। অনুমোদন পেলে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।

.

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেলের ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাইকার বিভিন্ন শর্ত এবং কম প্রতিযোগিতা। দরপত্রে ঠিকাদার হিসেবে জাপানি কোম্পানিগুলো অংশগ্রহণ করে। তারা চড়া দাম হাঁকায়, যেখানে দর-কষাকষির সুযোগ কম থাকে। এর বাইরে দরপত্র দলিলে কাজের এমন পদ্ধতি ও প্রযুক্তির কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। এ জন্য দরপত্রে সেভাবে প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। লাফিয়ে ব্যয় বাড়ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না আনতে পারলে ব্যয় কমবে না। সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থাকে বুঝিয়ে শর্ত শিথিল করতে পারে, তাহলে ব্যয় এমনিতেই কমে যাবে। এটি পানির মতো পরিষ্কার। টাকার অবমূল্যায়ন, নকশায় পরিবর্তন, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে। আকাশচুম্বী হওয়ার সুযোগ নেই।