মরুভূমিতে সন্ধ্যা ঘনায় নির্মল নীরবতায়। প্রতিটি বালুকণায় প্রতিবিম্বিত হয় গোধূলির রক্তরং ফুলকি। সেই ফুলকি শতাব্দীর সংগ্রামী ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মরু হাওয়ায় ভেসে যায় দূর সীমান্তে। নির্জন মরুপ্রান্তর চেনে না নির্ঝরের অবিরাম প্রবাহ, স্রোতস্বিনীর অফুরান স্রোতোধারা তার কাছে অলীক কল্পনা। মরুজীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে আছে শুধু অস্তিত্বের সংগ্রাম। প্রতিটি নির্জন তাঁবুতে টানাপোড়েনের টগবগে উত্তাপ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনায় আরবের মরুভূমির দুঃসাহসী বেদুইনের চিত্রায়ন হয়েছে ঠিক এভাবে—

‘ছুটেছে ঘোড়া, উড়েছে বালি,

জীবনস্রোত আকাশে ঢালি,

হৃদয়তলে বহ্নি জ্বালি,

চলেছে নিশিদিন।’

বহুকাল আগে এমনই এক মরুভূমিতে এক বেদুইন দম্পতির বসবাস। টানাপোড়েনের তীব্রতায় তাদের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। উষ্ণ, অনুর্বর মরুপ্রান্তরে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় জর্জরিত জীবন; জীর্ণ শরীর, ক্লান্ত-হতাশ মন। জীবিকার কোনো পথ খোলা নেই। ক্ষুধায় কাতর দম্পতির ক্লান্ত চোখের চাহনিতে চাঁদ যেন পোড়া রুটি। বেদুইন স্ত্রী সারাক্ষণ ভাবনায় মগ্ন—কীভাবে মিলবে এর প্রতিকার? বস্তুজীবনের সাফল্যের সেই চকচকে চাবিখানা কোথায় রয়েছে? আভিজাত্যের অক্ষরে কীভাবে নির্মিত হবে অস্তিত্বের দালান?

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ নতুন এক উপলব্ধির উত্থান।

.

সেই সময়ে বাগদাদে এক দানশীল বাদশাহ বহাল ছিলেন। তিনি ছিলেন দান ও দয়ায় দীপ্তিমান দিবাকর। তাঁর দয়া–দাক্ষিণ্যের রৌশনে উদ্ভাসিত জগৎকুল। তাঁর নৈকট্যই দিতে পারে বেদুইন দম্পতির চূড়ান্ত মুক্তি। বাদশাহ যেন সৌভাগ্যের পরশপাথর—যার ছোঁয়ায় লোহা হয় সোনা। দরাজ–দিল বাদশাহর সাহচর্যে তেমন পরিবর্তিত হয়ে যায় ভাগ্য।

স্বামী মুখ খোলে, কী উপায়ে দরবারে তার মিলবে নজরানা? হাজির হতে রাজপ্রাসাদে চাই কি বাহানা? কোনো উসিলা ছাড়া রাজদরবারে প্রবেশাধিকার মিলবে কি?

বেদুইন স্বামীর মনের অবস্থা যেন মজনুর মতো। লাইলির অসুস্থতার খবর শুনে একবার মজনুর মনে তোলপাড় উঠেছিল। কিন্তু সে মনে মনে ভাবে, সে তো কবিরাজ নয়; তার হাতে কোনো বিশেষ সম্বল নেই। আবার পরক্ষণে ভাবে, লাইলির এমন দুর্দিনে যদি না দেখতে যাই, তবে বিষয়টা কেমন হবে!

বেদুইন স্ত্রী মতামত দিল, ‘কৌশল একটাই। আমাদের একান্ত নিষ্ঠা ও সততা প্রমাণ করা চাই। নিজের অস্তিত্বের ইট দিয়ে গড়া কষ্টার্জিত উৎসর্গ চাই।’

এটা বড্ড কঠিন কাজ। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত বেদুইনের পক্ষে এমন উৎসর্গ কী হতে পারে?

.

শুষ্ক, বিরান মরুভূমিতে সবচেয়ে দুর্লভ জিনিস পানি—এ ছাড়া অন্য কিছু নয়। দরিদ্র বেদুইনের কোনো সম্পত্তি নেই, তবে আছে শুধু এক মশক পানি। অনেক শ্রমে তিলে তিলে জমানো বৃষ্টির পানি—এটুকুই দম্পতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অমূল্য অমৃতের সুধা।

বেদুইন স্ত্রী পরামর্শ দিল স্বামীকে, পানির পাত্রটি নজরানা হিসেবে নিয়ে যেতে। একই সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি দেয় যে রাজদরবারে হিরে-মাণিক্য অঢেল আছে বটে; এমন সুপেয় পানি তো নিশ্চয়ই নেই!

সারা জীবন যাদের কেটেছে মরু-শুষ্কতায়, তাদের কল্পনায় বাকি পৃথিবী যেন মরু-হাহাকারে আক্রান্ত। মানুষ তাদের জ্ঞান ও দৃষ্টির গণ্ডির বাইরে ভাবতে অক্ষম। বেদুইন স্ত্রীর এ ধারণা সেই সীমাবদ্ধতারই ফসল।

অথচ বাগদাদে বয়ে গেছে যে দজলা নদী, অফুরান জলধারা—যেখানে পানি মোটেও বিলাসিতা নয়। দজলার স্বর্গীয় শোভা ও উদার স্রোতের কলকল ধ্বনিতে মুখর বাদশাহর শহর।

নজরানা নির্ধারিত হয়েছে। এবার সুন্দরভাবে প্রস্তুত করার পালা।

স্বামী বলল মোটা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে সেলাই দিতে। পানিভর্তি পাত্রের যত্ন নিতে এই সুরক্ষাব্যবস্থা। এই পাত্র যেন অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। অস্তিত্বের সুরক্ষার জন্যও সেলাই প্রয়োজন—ইন্দ্রিয়ের প্রবেশমুখে সেলাই বাঁচাতে পারে জাগতিক কলুষতা ও অপবিত্রতা থেকে।

.

বেদুইন স্বামী রওনা দিল রাজদরবার অভিমুখে। স্ত্রী বসল প্রার্থনায়। আন্তরিক আকুতি ও অশ্রু নিয়ে স্রষ্টার কাছে আরজি করল, যাতে স্বামী পৌঁছাতে পারে পরম লক্ষ্যে কণ্টকসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে।

অবশেষে পানির সুরাহি নিয়ে বেদুইন নিরাপদে বাগদাদ পৌঁছাল। বাদশাহর দরবারে দয়াপ্রার্থীদের ভিড়। মহাসমারোহে চলছে দান। দয়াপ্রত্যাশী দরিদ্রদের বেসামাল ভিড়। নানা কৌশলে একেকজন লাভ করছে দয়াদান। বাদশাহর দরবারে বৈষম্য নেই, কালো-ধলার ভেদাভেদ নেই। বাদশাহ নিজেই উন্মুখ হয়ে আছেন অভাবীর খোঁজে। দানের ভান্ডার নিয়ে আহ্বান করছেন ভিখারিদের। ভিখারি চায় দক্ষিণা, বাদশাহ চান দানের বাহানা।

বেদুইন ভাবছে, মনের আকুতি কীভাবে প্রকাশ করবে। কিন্তু আশ্চর্য! মুখ খোলার আগেই রাজদরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এগিয়ে এলেন তার কাছে। অপ্রত্যাশিতভাবে অভ্যর্থনা দিলেন, হালহকিকত জানতে চাইলেন।

এই দরবারের রীতি এমনই—কেউ লজ্জিত হয়ে দয়া চাওয়ার আগে তাকে দুহাত ভরে দেওয়া হয়।

এমন উষ্ণ অভ্যর্থনা বেদুইন জীবনে কখনো পাওয়া দূরের কথা, স্বপ্নেও ভাবেনি। রাজদরবার যেন ভালোবাসার উদার রাজধানী। ভালোবাসায় হৃদয় প্লাবিত হলে প্রতিদানের আশা তুচ্ছ হয়ে যায়। ভালোবাসার বাদশাহর সান্নিধ্যেই হয়ে ওঠে সর্বসুখের উৎসস্থল।

বেদুইনের তা–ই ঘটল।

.

বাদশাহর কাছ থেকে উপহারপ্রাপ্তি তার মুখ্য উদ্দেশ্য রইল না। অন্তরের অবস্থা রূপান্তরিত হয়ে গেল।

বেহেশতি উদ্যানে গন্ধমের ফল আদমকে রূপান্তর করেছিল অস্তিত্বের বীজে। গভীর কূপে বালতি ফেলা হয়েছিল পানির তৃষ্ণা মেটাতে। শেষমেশ তৃষ্ণা মেটাল ইউসুফের রূপের রোশনিতে।

অথবা মিসরের পথে মুসার সেই যাত্রার কথা ধরা যাক। আঁধার ঘনিয়ে রাত নামে, কনকনে শীত। সাথে স্ত্রী। দূর পাহাড়ের সমান হয় আগুনের মতো কিছু। প্রচণ্ড শীত থেকে বাঁচতে সেটি সংগ্রহ করতে যান তিনি। গিয়ে দেখেন, এটি নিছক কোনো আগুন নয়; বরং খোদায়ি নুরের ঝলকানি। চাইলেন এক আগুন, পেলেন অন্য এক নুর।

যাহোক, অবশেষে দয়ালু বাদশাহ বেদুইনকে ডেকে নিলেন। তার উপহার সাদরে গ্রহণ করলেন। সেই কলস ভর্তি করে স্বর্ণমুদ্রা দিলেন। বেদুইন যা ভাবেনি, তার অধিক পেয়ে ভাবাবেগে বেসামাল।

এখানেই শেষ নয়।

.

বাদশাহর নির্দেশ কর্মচারীদের ওপর—তাকে যেন দজলা নদীপথে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়। নদীপথ অধিক সহজ ও সুবিধাজনক। বেদুইন এসেছিল স্থলপথে অধিক কষ্টে প্রতিকূল পরিবেশ পাড়ি দিয়ে। দজলার নদীপথ তার অচেনা।

যেইমাত্র বেদুইনকে দজলা নদীর নৌঘাটে আনা হলো, সে তো লজ্জায় কুঁকড়ে যায়। এমন অথই জলরাশি জীবনে প্রথম অবলোকন করে সে। এমন উচ্ছল স্রোতোধারায় পানির সশব্দ প্রবাহ তার কাছে স্বপ্নের মতোই।

রাজদরবারে সুপেয় পানির অফুরান সম্ভার!

বেদুইন ভাবল, আমার সামান্য কলসের কাদা-বালু মেশানো পানি নিয়ে কত কিছুই না ভাবলাম! কত গৌরবই না ছিল মনে! মহাদয়াবান বাদশাহর কাছে বিন্দুমাত্র অভাব নেই। বাদশাহ তাঁর এই তুচ্ছ উপটৌকনের মুখাপেক্ষী নন। অথচ কত মহান তিনি! উপহার ফিরিয়ে দেননি; বরং পুরস্কৃত করেছেন।

বেদুইন তার সাধ্যের সবটুকু উজাড় করে, হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও একাগ্রতা দিয়ে, স্বচ্ছ হৃদয়ে এটুকুই সমর্পণ করেছে। বাদশাহর কাছে সেটিই গ্রহণযোগ্য হয়েছে।

বেদুইনের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হলো—কলস যতই ছোট হোক, জল যতই সামান্য হোক, শুধু হৃদয়টা যেন না শুকায়।

অসীমের দরবারে সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হচ্ছে উৎসর্গিত হৃদয়।

এটি কোনো রূপকথার গল্প নয়।

.

কোনো মরুচারীর মুখে প্রচারিত লোকগল্প নয়। প্রায় আট শ বছর আগে আনাতোলিয়ার এক আধ্যাত্মিক কবি তাঁর লেখা ‘মসনভি’র পরতে পরতে এসব গল্পের লোভনীয় দানা ছিটিয়েছেন। অনুসন্ধিৎসু কবুতরের মতো দানা মুখে নিয়ে অগ্রসর হলেই অজান্তে উন্মোচিত হয় আত্মদর্শনের নব নব দ্বার।

তিনি আর কেউ নন।

তিনি জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি।

এই গল্প নিছক কোনো কাহিনি নয়। আমরাই সেই গল্পের বেদুইন। আমাদের আছে হৃদয়ের সীমিত কলস। আর সৃষ্টিজগতের বাদশাহর আছে করুণার দজলা নদী। আমাদের হৃদয়ের কলসের কিঞ্চিৎ পানি হচ্ছে আন্তরিক ভালোবাসা, ভক্তি।

অসীমের সামনে সীমিত পাত্র যদি ভক্তির জলে পূর্ণ করে উপস্থাপন করা যায়, তবেই করুণার দজলার অচেনা পথের সন্ধান মেলে।

আমাদের সবারই যাত্রা যেন সেই বেদুইনের পথ ধরে—ছোট্ট একটি কলস হাতে, দজলার অভিমুখে।

সূত্র: জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি, মসনভি-ই মা‘নভি, প্রথম খণ্ড, বেদুইন ও বাদশাহর কাছে পানির কলস উপহারের কাহিনি, পঙ্‌ক্তি ২৮৪৮-২৮৭২।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘দুরন্ত আশা’, মানসী।