মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিসিক শিল্পনগরী উদ্বোধনের সাত বছর পার হতে চললেও এখনও পর্যন্ত কোনো উদ্যোক্তা আকৃষ্ট করতে পারেনি। আধুনিক অবকাঠামো, পিচঢালা রাস্তা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ ও প্রশাসনিক ভবন থাকার পরও উচ্চ প্লট মূল্য, দুর্বল নিরাপত্তা ও চুরির ঘটনায় এটি এখন অপরাধীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

২০১২ সালে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র-কুটির শিল্প উন্নয়নে ২০ একর জমিতে এই শিল্পনগরীর পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১৯ সালের মধ্যে প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক কোয়ার্টার, পাম্প হাউস, গ্যাস সাবস্টেশন ও অভ্যন্তরীণ রাস্তা সম্পন্ন হয়। তিনটি ক্যাটাগরিতে (এ, বি, এস) মোট ১২২টি প্লট তৈরি করা হলেও প্রতি শতক জমির ইজারা মূল্য ৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করায় বিনিয়োগকারীরা এড়িয়ে চলছেন। সংলগ্ন এলাকার বাজারদরের চেয়ে এটি অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বাইরে কম খরচে জমি কিনে কারখানা স্থাপন করছেন।

বরাদ্দকৃত ৬২টি প্লটের মধ্যে বাস্তবে সচল হয়েছে মাত্র ১টি কারখানা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সচল কারখানা ‘আসাদ অ্যাগ্রো ফুড’-এর এক কর্মকর্তা জানান, শতভাগ গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা করা হয়নি। বাধ্য হয়ে তারা সীমিত পরিসরে কাজ চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত পরিষেবা না পেয়ে প্লট ফেরত দিতে গিয়ে প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছেন বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী; ফেরত পাননি জামানতের টাকাও।

দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় এলাকাটি অপরাধীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি এস্টেটের ৭টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও গ্যাসের পাইপলাইনের কোটি টাকার যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাওয়ায় শিল্প এলাকাটি পুরোপুরি বিদ্যুৎহীন ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। বিশাল ২০ একর ভূখণ্ড পাহারা দেওয়ার জন্য রয়েছে মাত্র ১ জন নৈশপ্রহরী। নৈশপ্রহরী বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, পুরো এলাকা জঙ্গলে ভরে গেছে। এত বড় জায়গা একজনের পক্ষে পাহারা দেওয়া অসম্ভব। ট্রান্সফরমার চুরির পর থেকে বিদ্যুৎ নেই, রাতে একাধিকবার ডাকাতদের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

মৌলভীবাজারের তরুণ উদ্যোক্তা সামি আহমেদ বলেন, বাস্তবিক অর্থে মৌলভীবাজারে উদ্যোক্তার সংখ্যা এখানে কম। বিসিক পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে বা নতুন বিনিয়োগকারী আকর্ষণ করতে পারেনি। এখানে তুলনামূলক জায়গার দাম বেশি হওয়ায় অনেকেই বাহিরে জমি ক্রয় করছেন।

শ্রীমঙ্গল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামাল মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিসিকের এই অচলাবস্থা কাটাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণ বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে প্লটের দাম কমাতে হবে। চুরি হওয়া ট্রান্সফরমার ও গ্যাস সরঞ্জাম দ্রুত প্রতিস্থাপন করে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত আনসার/নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ এবং নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা জরুরি। যেসব বরাদ্দপ্রাপ্ত উদ্যোক্তা জমি ফেলে রেখেছেন, তা উদ্ধার করে নতুন উদ্যোক্তাদের পুনঃ বরাদ্দ দেওয়া উচিত।

শ্রীমঙ্গল বিসিক শিল্পনগরীর অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোনায়েম ওয়ায়েছ সরঞ্জাম চুরির সত্যতা স্বীকার করে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং চুরি হওয়া মালামাল নতুন করে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ১২২টি প্লটের মধ্যে ৬২টি প্লট বিক্রি হয়েছে। ৬টি প্লটের কাজ খুব শিগগিরই শুরু হবে। এখানে মানুষ যত বৃদ্ধি পাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততই জোরদার করা হবে। বাস্তবিক অর্থে এই অঞ্চলে উদ্যোক্তাদের সংখ্যা কম। যারা আছেন বেশিরভাগ বাহিরের। এই শিল্প নগরীর প্লট কেনার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তারা এগিয়ে আশা প্রয়োজন।