অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গুমের তদন্ত ও বিচারে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছেন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম (তুলি)। তাঁর অভিযোগ, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের গুমের তদন্তে যে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার হওয়া জামায়াতের বাইরের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা হয়নি।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এই অভিযোগ করেন সানজিদা ইসলাম। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর এই সমন্বয়ক গুম তদন্তের অগ্রগতি দেখতে আজ চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন গুমের ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।

বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলামের বোন সানজিদা ইসলাম বর্তমানে বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য।

সাংবাদিকদের সানজিদা ইসলাম বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, গুমের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার ট্রাইব্যুনালে গতি পাবে। ‘মায়ের ডাক’ থেকে প্রায় ১৫০টি গুমের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে এক যুগের বেশি সময়ের তথ্য-উপাত্তও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর তিন মাসেও কোনো তদন্তের অগ্রগতি দেখা যায়নি।

সানজিদা ইসলাম আরও বলেন, “যখন আমরা বিচার চেয়েছি, যখন আমরা আন্দোলনে দাঁড়িয়েছি, সবাইকে নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমাদের আশা ছিল, যখন বিচারকার্য শুরু হবে, তখন সবার জন্য একসঙ্গে হবে। এখানে কোনো সিলেকশন থাকবে না। সিলেকশন কেন ওই তিনটা কেসে করা হয়েছিল?...জামায়াতের তিনটা কেসকে।”

তিনি উল্লেখ করেন, ফ্যাসিস্টের সময় তদন্তকাজ হয়নি, মামলাও হয়নি। ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এক বছর তিন মাসেও কোনো কিছু এগোয়নি। তাঁর মতে, “এখানে আমার মনে হয়, আমাদেরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে কাজ করার দরকার ছিল, যেটা হয়নি। এ জন্যই কেসগুলোর মুভ...কোনো অগ্রগতি দেখতে পাইনি।”

সানজিদা ইসলাম যে তিনটি মামলার কথা বলছেন, তার মধ্যে একটি হলো র‌্যাবের টিএফআই সেলে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) সহ অনেককে গুম করে রাখার ঘটনা। এই মামলায় বর্তমান-সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিচার চলছে ট্রাইব্যুনালে। আরেকটি মামলা হলো ডিজিএফআইয়ের জেআইসিতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ অনেককে গুমের ঘটনা। এই মামলায়ও বর্তমান-সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৩ আসামির বিচার চলছে। আযমীর বাবা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির প্রয়াত গোলাম আযম।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর ছিলেন মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বিএনপি সরকার গঠন করলে চিফ প্রসিকিউটর হন মো. আমিনুল ইসলাম।

সানজিদা ইসলাম জানান, তাঁদের গুমের অভিযোগের তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বর্তমান চিফ প্রসিকিউটরের চেষ্টা তাঁরা দেখছেন।

পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, সব গুম পরিবারের সদস্যদের প্রতি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের অকৃত্রিম সহানুভূতি রয়েছে। কে কোন দলের মানুষ, এভাবে পার্থক্য করে তাঁরা দেখতে চান না। তাঁরা দেখতে চান, যাঁরাই গুমের শিকার হয়েছেন, তাঁরা গুম পরিবারের সদস্য।

‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলামের উদ্দেশে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মীর আহমাদ বিন কাসেম ও আবদুল্লাহিল আমান আযমীর মতো কয়েকটি গুমের বিচার চলছে। কাকতালীয়ভাবে হোক বা যেভাবেই হোক, তাঁরা হয়তো একটি দলের অনুসারী। তবে এর মানে এই নয় যে বিএনপির যাঁরা ভুক্তভোগী হয়েছেন, তাঁদের বিচার হবে না। বিষয়টিকে তাঁরা দলীয়ভাবে দেখতে চান না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগের কেউ গুমের শিকার হলে তাঁদের জন্যও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

গুমের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাজের অগ্রগতির তথ্যও তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর। আমিনুল ইসলাম বলেন, ২৫০ পরিবারের সদস্যরা গুমের শিকার হয়েছেন, এর সত্যতা তাঁরা পেয়েছেন। সে পরিবারগুলো তাঁরা চিহ্নিতও করেছেন। ২৫০ মানে যাঁরা ফেরত আসেননি। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক অপহরণের শিকার হয়েছেন, সেটাও তাঁরা নিশ্চিত হয়েছেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, গুমের শিকার প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের জবানবন্দি নেওয়া হচ্ছে। যে স্থান থেকে অপহরণ করা হয়েছিল, সেগুলোও তাঁরা চিহ্নিত করেছেন। সংখ্যা অনেক এবং প্রত্যেক পরিবার ধরে ধরে তদন্ত করতে হচ্ছে। সংগত কারণে তাঁদের একটু সময় লাগছে।

তদন্তের জন্য যৌক্তিক সময় চেয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা গুমের বিষয়গুলো তদন্ত করছেন। তদন্ত সম্পন্ন করে তাঁরা দ্রুতই প্রতিবেদন দেবেন।