গত ২৭ মে সকালে পাখিবিদ ও লেখক শরীফ খানের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে খুলনা থেকে বাগেরহাটের ফকিরহাটের দিকে রওনা হন জিয়া ভাই ও প্রতিবেদক। ফকিরহাট বাসস্ট্যান্ড থেকে যাত্রাপুর বাজারের দিকে যাওয়া পাকা সড়ক ধরে এগোতেই সড়কের পাশে একটি বিশাল প্রাচীন গাছ চোখে পড়ে। গাছটির ডালে ডালে সাদা রঙের ছোট ছোট ফল ধরেছিল, যা দেখতে ডুমুরের মতো। পাতাগুলো জগডুমুরের পাতার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় গাছটিকে সাদা পাকুড় হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
গাছটির বয়স অনুমান করার সময় দুজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা হয়। আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী ওই গ্রামবাসী জানান, ছোটবেলা থেকেই তারা গাছটিকে প্রায় একই রকম দেখছেন। তাদের মতে, গাছটি আগে আরও সতেজ ও বড় ছিল। বর্তমানে এর কিছু ডালপালা মরে গেছে এবং বাকল নষ্ট হচ্ছে। তারা আরও জানান, এই এলাকায় এমন গাছ আর কোথাও দেখা যায় না। গ্রামবাসীর অনুমান, গাছটির বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছর হতে পারে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গাছটির ওপর বিভিন্ন পরগাছা জন্মেছে, যার মধ্যে নানা ধরনের ফার্ন ও অন্যান্য পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ রয়েছে। এসব পরগাছার শিকড় সাদা পাকুড় গাছের বাকল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করছে, যা গাছের খাদ্য চলাচল ব্যাহত করছে এবং গাছটিকে দুর্বল করে ফেলছে।
সাদা পাকুড় বট পরিবারের মোরেসী গোত্রের একটি গাছ। এর ফল সাদা হওয়ায় এটি সাদা পাকুড় বা সাদা ডুমুর নামে পরিচিত। এর ইংরেজি নাম হোয়াইট ফিগ এবং উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Ficus virens। অশ্বত্থ গাছের মতো এর সব পাতা শীতকালে ঝরে যায় না, তাই এটিকে আধা পাতাঝরা গাছ বলা হয়। ডুমুরের মতো এর ফলও খাওয়া যায়, যদিও সাধারণত পাখিরাই এটি খায়। বট গাছের মতো এতে বড় ঝুরি দেখা যায় না। জলাভূমির ধারে এটি ১০০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, তবে শুকনো জায়গায় ৮০ ফুটের বেশি বাড়ে না। পর্যাপ্ত জায়গা পেলে এটি ছাতার মতো ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া দেয়। ফকিরহাটের আট্টাকী গ্রামের এই গাছটি অবশ্য জায়গার অভাবে সেভাবে ছড়াতে পারেনি।
সাদা পাকুড় গাছকে অনেকে সাদা ডুমুর ও ‘স্ট্র্যাঙ্গলার ফিগ’ নামেও চেনেন। পাখিরা এর ফল খেয়ে অন্য গাছে বিষ্ঠা ত্যাগ করলে বীজ সেখানে আটকে চারা গজায়। এই চারা আশ্রয়দাতা গাছের মধ্যে প্রবেশ করে একসময় সেটিকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে, কিন্তু নিজে টিকে থাকে এবং মাটিতে স্থায়ী আশ্রয় খুঁজে নেয়। বাংলাদেশে বসন্ত ও বর্ষাকালে বছরে দুবার এই গাছের বৃদ্ধি ঘটে। বসন্তে (ফেব্রুয়ারি থেকে মে) নতুন পাতা গজায় ও ফল ধরে, তখন গাছটিকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। কখনো কখনো এই গাছ লম্বার চেয়ে চারপাশে বেশি ডালপালা ছড়ায়, কিন্তু বটের মতো ঠেস দেওয়ার মূল বা ঝুরি তৈরি হয় না। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের একটি দেশীয় বৃক্ষ। ফকিরহাটের আট্টাকী গ্রামের এই প্রাচীন গাছটি বিপন্ন না হলেও সুলভ নয়, তাই এটিকে সংরক্ষণ করা জরুরি। ডাল কাটিংয়ের মাধ্যমে এর চারা তৈরি করা যেতে পারে। আইইউসিএন বাংলাদেশ এই প্রজাতিকে ‘ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যার অর্থ দেশে এই প্রজাতির গাছ অধিক সংখ্যায় বিদ্যমান থাকতে পারে, যদিও সচরাচর চোখে পড়ে না।