ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার শত শত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের কাঁধে এসে পড়ছে পাঠদান থেকে শুরু করে দাপ্তরিক চিঠিপত্র, হিসাব-নিকাশ, অনলাইন কার্যক্রম এবং উপজেলা পর্যায়ের সভার মতো সব প্রশাসনিক দায়িত্ব। মূল পদ সহকারী শিক্ষক হওয়া সত্ত্বেও এই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে তাঁদেরকে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অনুমোদিত ১ হাজার ১০৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ৬৯৬ জন। ফলে ৪০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
শূন্য পদের হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নবীনগর উপজেলা। সেখানে ২১৯টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ১২৯ জন, ফলে শূন্য রয়েছে ৯০টি পদ। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় ১২৯টি পদের মধ্যে ৭৫ জন কর্মরত থাকায় শূন্য ৫৪টি, সরাইলে ১২৬টি পদের মধ্যে ৭৫ জন কর্মরত থাকায় শূন্য ৫১টি এবং কসবা উপজেলায় ১৬৩টি পদের বিপরীতে ১১৪ জন কর্মরত থাকায় শূন্য রয়েছে ৪৯টি পদ।
বিজয়নগর উপজেলায় ১০০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ৫২ জন এবং শূন্য ৪৮টি পদ। বাঞ্ছারামপুরে ১৩৯টি পদের মধ্যে ১০০ জন কর্মরত থাকায় শূন্য ৩৯টি এবং নাসিরনগরে ১২৬টি পদের বিপরীতে ৯০ জন কর্মরত থাকায় শূন্য ৩৬টি পদ। অন্যদিকে, আশুগঞ্জে ৪৯টি পদের মধ্যে ২৭ জন কর্মরত থাকায় ২২টি এবং আখাউড়া উপজেলায় ৫৪টি পদের মধ্যে ৩৪ জন কর্মরত থাকায় ২০টি পদ শূন্য রয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ওপর। একজন সহকারী শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে, ফলে পাঠদানে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষকসংকটে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল।
মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও রয়েছে বড় জনবল ঘাটতি। জেলার নয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনুমোদিত ৫৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ২০ জন; অর্থাৎ ৩৫টি পদ শূন্য। ফলে বিদ্যালয় পরিচালনা, শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রম এবং উপজেলা পর্যায়ের তদারকি—তিনটি স্তরেই প্রভাব পড়ছে এই সংকটের।
আশুগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম তালশহর পশ্চিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা জোনিয়া বেগম বলেন, "আমাদের বিদ্যালয়ে ৩২৪ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। মাত্র তিনজন শিক্ষক দিয়ে সবকিছু সামলাতে হচ্ছে। শিক্ষক কম থাকায় একাধিক সংযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যালয়ে শিক্ষক পাঠানোর বিষয়টি অবগত করলেও সেটি আমলে নেওয়া হয়নি।"
তিনি আরও বলেন, "ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজ, উপজেলা পর্যায়ের সভাসহ নানা কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। একজন সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে হলে তাঁর পাঠদানের সময় কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর।"
কসবা উপজেলার শ্যামবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক জহিরুল ইসলাম স্বপন জানান, দীর্ঘ এক দশক ধরে অনেক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে চলছে। তিনি বলেন, "প্রায় এক দশক ধরে অনেক বিদ্যালয় চলতি বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন জটিলতা ও দীর্ঘদিনের মামলার কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে ছিল।"
জহিরুল ইসলাম স্বপন আরও উল্লেখ করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকরা মূলত সহকারী শিক্ষক পদেই বহাল থাকেন এবং সেই পদ অনুযায়ী বেতন পান। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁরা মাসিক মাত্র দেড় হাজার টাকা দায়িত্বভাতা পান। তাঁর মতে, মামলার জটিলতা কাটলেও প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে সংকট নিরসন বিলম্বিত হচ্ছে।
এই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, "শূন্য পদগুলো পূরণে পর্যায়ক্রমে নতুন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নিয়োগ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রধান শিক্ষক সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।"
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে এবং ৪০৯টি বিদ্যালয়ে কবে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি তিনি। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্তিশালী করতে দ্রুত নিয়োগ ও পদোন্নতির জটিলতা নিরসন করতে হবে, অন্যথায় শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।