বরিশাল নগরীর চৌমাথা বাজারে সন্ধ্যা নামতেই মাছ ও হাঁস-মুরগি কেনাবেচার ব্যস্ততা বাড়ে। এই ভিড়ের মধ্যেই একটি দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা ‘বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া’ দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়ান। দোকানের সামনে বিয়ের কার্ড বা পাত্র-পাত্রীর ছবির বদলে সাজানো থাকে মুরগি, রাজহাঁস, চিনা হাঁস, কবুতরের বাচ্চা এবং খাসি-ছাগল-গরুর মাংস। এই ব্যতিক্রমী দোকানেই প্রতিদিন পাত্র-পাত্রীর খোঁজ করেন অনেকে।

দোকানের মালিক শহিদুল ইসলাম স্বপন প্রায় ২০ বছর ধরে ঘটকালির সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় তিনি ২৫০টির বেশি বিয়ে দিয়েছেন। ঘটকালির পাশাপাশি তিনি দেশি মুরগি, রাজহাঁস, চিনা হাঁস, কবুতরের বাচ্চা এবং লাইভ ওয়েটে খাসি, ছাগল ও গরুর মাংস বিক্রি করেন।

এমন নামকরণের কারণ জানতে চাইলে স্বপন বলেন, “অনেক ক্রেতা হাঁস-মুরগি কিংবা খাসি কিনতে গিয়ে আমার কাছে ভালো পাত্র বা পাত্রী খোঁজেন। তাদের অনেকের বিয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমি নিজে থেকে বেচাকেনার সময় কাউকে বিয়ের কথা বলি না। তবে ফেসবুকে আমার কার্যক্রম দেখে অনেকেই ফোন করেন।”

বরিশাল সদর উপজেলার জাগুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম স্বপন স্থানীয় বারেক চাপরাশির ছেলে। তার ‘বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া’ নামে ফেসবুক ও ইউটিউব কার্যক্রমও রয়েছে, যেখানে তিনি বিয়ে-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন।

স্বপনের ঘটকালির শুরুটা ছিল নিজের ভাইয়ের জন্য পাত্রী খুঁজতে গিয়ে। সে সময় তার হাতে কয়েকশ পাত্রীর জীবনবৃত্তান্ত আসে। ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও সেই জীবনবৃত্তান্তগুলো থেকে তিনি অন্যদের জন্য পাত্রী খোঁজা শুরু করেন। ধীরে ধীরে পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকেরা তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন এবং একটি বড় যোগাযোগের নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। একপর্যায়ে তার কাছে এক হাজারের বেশি পাত্র-পাত্রীর জীবনবৃত্তান্ত জমা হয়। তখন তিনি ডিশের লাইনের স্থানীয় টিভি চ্যানেল এবং স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করেন। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক জনপ্রিয় হলে সেখানেও বিয়ের বিজ্ঞাপন দেন।

স্বপন জানান, “একসময় চৌমাথা সোনালী ব্যাংকের সামনে আমার অফিস ছিল। পরে বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অফিস ছেড়ে দিই। আর ম্যারেজ মিডিয়ার ব্যবসায় বিয়ে ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো আয় ছিল না। তাই প্রায় পাঁচ বছর আগে বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া নামেই চৌমাথা বাজারে হাঁস-মুরগি ও খাসি বিক্রির দোকান দিই।”

ঘটকালির আয় সম্পর্কে স্বপনের বক্তব্য কিছুটা ব্যতিক্রমী। তার দাবি, ঘটকালিতে নানা ধরনের নয়ছয় করে বেশি টাকা আয় করা সম্ভব হলেও তিনি সে পথে হাঁটেননি। তার ভাষায়, “মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাত্র বা পাত্রীকে ধনীর ঘরে বিয়ে দিয়ে অর্থ উপার্জন করার সুযোগ থাকলেও আমি তা করি না।” তিনি আরও বলেন, “আমি সেসব পারি না। পারলে তো বিকল্প ব্যবসা দিতে হতো না। বিয়ের পর দুই পরিবার খুশি হয়ে যা দেয়, তাতেই আমি খুশি। এমনও বিয়ে দিয়েছি, যেখানে ৩০ হাজার টাকা বকশিশ পেয়েছি। আবার সাধারণভাবে একটি বিয়ে করিয়ে দিলে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব।”

তার দাবি, ঘটকালির মাধ্যমে এমনও বিয়ে হয়েছে, যার পর পাত্র বা পাত্রীকে বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখনো তাদের অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন। স্বপনের কাছে ঘটকালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দুই পক্ষকে সঠিক তথ্য দেওয়া। তিনি বলেন, “নয়ছয় করি না বলেই পাত্র-পাত্রীর জীবনবৃত্তান্তসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দুই পরিবারকে বুঝিয়ে দিই। এরপর তারা নিজেরা যাচাই-বাছাই করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।”

চৌমাথা বাজারে তার দোকানে একদিকে ক্রেতারা হাঁস-মুরগি ও মাংস কিনতে আসেন, অন্যদিকে কেউ কেউ খোঁজ নেন পাত্র-পাত্রীর। ফলে দোকানটি এখন শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, অনেকের কাছে বিয়ের সম্ভাব্য সম্পর্কেরও এক অদ্ভুত ঠিকানা। শহিদুল ইসলাম স্বপনের স্বপ্ন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে বরিশাল ম্যারেজ মিডিয়া চালিয়ে যাওয়া। তার কাছে ব্যবসার পাশাপাশি ঘটকালি এখন দুই দশকের পরিচিতি, সম্পর্ক ও মানুষের আস্থার একটি অংশ।