মৌলভীবাজারের রাজনগরের কাউয়াদীঘি হাওরাঞ্চলে শতকোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়িত কাশিমপুর পাম্প হাউসটি এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাম্পগুলো নিয়মিত চালু না রাখায় পুরো হাওরাঞ্চলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যার ফলে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা সহস্রাধিক কৃষক পরিবারের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

জানা গেছে, মনু সেচ প্রকল্পের অন্তর্গত এই কাশিমপুর পাম্প হাউসের পাম্পগুলো সার্বক্ষণিক সচল না থাকায় চলতি মৌসুমে কাউয়াদীঘি হাওরাঞ্চলের অন্তত ৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া আগে থেকে আবাদ করা পাকা আউশ ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। মূলত এই পাম্প হাউসের মাধ্যমেই হাওরের পানির প্রবাহ ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করে চাষাবাদ পরিচালনা করা হয়।

ভুক্তভোগী স্থানীয়দের অভিযোগ, ফসল রক্ষা প্রকল্পের এই পাম্প হাউসটি বর্তমানে একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ নিয়ম মেনে পানি নিষ্কাশন করছে না। অভিযোগ উঠেছে, পাউবোর কয়েকজন অসাধু কর্মচারী ও ঘের ইজারাদারদের যোগসাজশে পাম্প পরিচালনা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তাদের স্বার্থ রক্ষায় সৃষ্ট এই জলাবদ্ধতার কারণে চলতি মৌসুমে তিন হাজার হেক্টর জমির ফসলহানি ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক শেখ আহবাবুর রহমান বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনস্থ কাশিমপুর পাম্প হাউস কর্তৃপক্ষ কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। বিভিন্ন অজুহাতে সেচ বন্ধ রেখে তারা ঘের ইজারাদারদের স্বার্থ রক্ষা করছে। ইজারাদারদের ছাড়া পোনা মাছ যেন দ্রুত বড় হতে পারে, সে জন্যই পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে।”

অন্য দুই কৃষক কামাল হোসেন ও ফজলুর রহমান জানান, গত বোরো মৌসুমে তারা এক-তৃতীয়াংশ ফসলও ঘরে তুলতে পারেননি। বর্তমানে আউশ ধান কোমরসমান পানিতে তলিয়ে আছে। পাম্প না চলায় পানি কমছে না, ফলে আমনের বীজতলার চারার বয়স পেরিয়ে গেলেও তা রোপণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের দাবি, পানি দুই থেকে আড়াই ফুট কমাতে পারলে সাড় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদন সম্ভব হতো।

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত কাউয়াদীঘি হাওর এই জেলার প্রধান শস্যভান্ডার। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ও কুয়েতের যৌথ অর্থায়নে শুরু হওয়া মনু প্রকল্পের কাজ ১৯৮০ সালে শেষ হয়। তখন রাজনগরের কাশিমপুরে আটটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প স্থাপন করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বর্ষায় অতিরিক্ত পানি কুশিয়ারা নদীতে নিষ্কাশন করে ফসল রক্ষা করা।

মৌলভীবাজার হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্যসচিব খছরু চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, “১৯৮০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত হাওরের পানির লেভেল নির্ধারণী স্কেলটি হাওয়া বিলে ছিল। ২০০৪ সালে পাউবোর অসাধু কিছু কর্মকর্তা ইজারাদারদের সুবিধা দিতে স্কেলটি সরিয়ে পাম্প হাউসের কাছের গভীর ক্যানেলে স্থাপন করেন। ফলে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি করে সাধারণ কৃষকদের খেসারত দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।”

এই বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, সরেজমিনে আউশ খেত পানিতে তলিয়ে থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশন ও আমন চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, “বর্তমানে হাওরে পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটারে রয়েছে, যা সাড়ে ৮ মিটার থাকার কথা। তবে মিটার স্কেল সরানোর বিষয়ে আমার জানা নেই। পাম্প হাউসের বর্তমান সক্ষমতায় দুই ফুট পানি কমাতে বৃষ্টিহীন অবস্থায়ও অন্তত ৪০ দিন সময় লাগবে এবং এর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।”