সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়াদেশ দেওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি কার্গোও দেশে না আসায় বিপাকে পড়েছে সরকার। এখন চাহিদামতো এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আগস্টের জন্য তিন কার্গো এলএনজি কিনতে তিন দফায় দরপত্র ডেকে পাওয়া গেছে দুটি। ফলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না, কাটছে না সংকট।
জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে এলএনজি আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আমদানির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত তিন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রতি দরপত্রে এলএনজির দাম বাড়ছে। ডিপিএম না করে আগে দরপত্র ডাকা হলে কম দামে এলএনজি পাওয়া যেত।
.গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০–১১ মার্কিন ডলার। গত এপ্রিলের শেষ দিকে দাম ছিল ১৪–১৫ ডলার। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ২২ ডলারে পৌঁছায়।.সংকট কাটছে না, এলএনজির কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা .
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, আগস্টের তিনটি ও সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য দুটি এলএনজি কার্গো কিনতে ১৭ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই দিন ২৩-২৪ আগস্ট ও আগামী ৪-৫ সেপ্টেম্বরের দুটি কার্গোয় ২২ ডলারের কম দাম দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি)। অন্য তিনটির জন্য আবার দরপত্র আহ্বান করা হয় ১৮ আগস্ট। এবার ১-২ সেপ্টেম্বরের জন্য ২৪ ডলারের নিচে দর দিয়ে সর্বনিম্ন দরদাতা হয় সৌদি আরামকো। তৃতীয় দফায় ১৯ আগস্ট দুটির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে ২৬-২৭ আগস্টের কার্গো দিতে ২৫ দশমিক ৩১ ডলার দর দিয়ে সর্বনিম্ন হয় বিপি। আর ২৯-৩০ আগস্টের কার্গোতে দর এসেছিল আরও বেশি, তাই এটি না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেপ্টেম্বরের জন্য আরও তিনটি কার্গো কিনতে গতকাল দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
.আগের চেয়ে সরবরাহ বেড়েছে। এলএনজি যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার মাধ্যমে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীন এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।মো. আবদুল মান্নান, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং শীত সামনে রেখে ইউরোপের বাড়তি চাহিদা এলএনজির দাম বাড়িয়েছে। গত ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০–১১ মার্কিন ডলার। গত এপ্রিলের শেষ দিকে দাম ছিল ১৪–১৫ ডলার। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ২২ ডলারে পৌঁছায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দরপত্রের মাধ্যমে নির্বাচন করা তিনটি এলএনজি কার্গোর অনুমোদন দেয়নি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ওই তিনটির দাম ছিল ২০ থেকে সাড়ে ২১ ডলারের মধ্যে। আরও কম দামে কেনার নামে বেশ কিছু কার্গো সরাসরি কেনার ক্রয়াদেশ অনুমোদন করা হয়। এসব কার্গোর চারটি আগস্টে আসার কথা ছিল, যার একটিও আসেনি। এতে দেশে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ঘাটতি পূরণে এখন উচ্চ দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।
এলএনজি আমদানির সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ১ ডলার বাড়লে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হয় ৪১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এখন ৪ ডলার বাড়তি দামেও এলএনজি কিনতে হয়েছে। তার মানে এক কার্গো এলএনজি কিনতে সরকারের বাড়তি খরচ হয়েছে অন্তত ১৬৫ কোটি টাকা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আগের চেয়ে সরবরাহ বেড়েছে। এলএনজি যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তার মাধ্যমে সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীন এলএনজি কার্গো আনার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
.সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না। শীতের আগেই তাই এলএনজি মজুত করছে ইউরোপ। এলএনজি কার্গোর সংকট আছে বিশ্ববাজারেই। তাই দরপত্র বারবার ডাকলেও কার্গো পাওয়া কঠিন হবে। আগামী মাসেও সরবরাহ পেতে ভুগতে হতে পারে।.এলএনজির কার্গো এসেছে, বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ; তবে সংকট পুরোপুরি কাটছে না.
দেশে ৯ বছর ধরে দেশি গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির, অন্যটি দেশি কোম্পানি সামিটের। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এক্সিলারেটের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। দুটি মিলে দিনে সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হতো।
জুলাই মাসে দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তি এবং স্পট মার্কেটের মাধ্যমে মোট ১১ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল। অগ্নিদুর্ঘটনার পর আমদানি লক্ষ্য কমাতে হয়। আগস্টে মোট ৯ কার্গো এলএনজি আসার কথা, এসেছে ৪টি। তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এসেছে একটি। স্বল্পমেয়াদি চুক্তির অধীন সৌদি আরামকোর জাহাজ এলেও তা স্থানান্তরের উপযোগী নয় বলে খালাস করা যায়নি। আর সরাসরি কেনা চারটি কার্গোর একটিও না আসায় জরুরি দরপত্রের মাধ্যমে বেশি দামে গত শনিবার একটি কার্গো আনা হয়েছে।
টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস-সংকটের পর ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে। তবে এলএনজির নতুন কার্গো না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমতে কমতে ১৯ আগস্ট বিকেলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সামিটের টার্মিনাল থেকে সক্ষমতার বেশি হারে সরবরাহ করা হয়। এরপর নতুন করে দরপত্র ডেকে কেনা একটি কার্গো শনিবার বঙ্গোপসাগরে পৌঁছায়। ওই দিন বিকেলে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে এক্সিলারেট। এতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। তবে পরের এলএনজি কার্গো আসার নিশ্চয়তা না থাকায় সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে। এতে গ্যাস–সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও সময় লাগতে পারে।
.আপাতত সরকারকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। এখনকার চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। সব মিলে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।ম তামিম, জ্বালানিবিশেষজ্ঞ
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হতো ১০৫ কোটি ঘনফুট, বাকিটা দেশি গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করা হয়। এক মাস ধরেই এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে গড়ে সক্ষমতার অর্ধেক। শনিবার থেকে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় এলএনজি সরবরাহ করা হয়েছে ৭৫ কোটি ঘনফুট। মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে ২৩৮ কোটি ঘনফুট।
সাধারণত চুক্তির অধীন ও দরপত্রের মাধ্যমে—দুই প্রক্রিয়ায় এলএনজি আমদানি করা হয়। কাতার ও ওমানের সঙ্গে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি আছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এ দুটি দেশ থেকে এলএনজি আসা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে একটি বা দুটি করে পাঠায় তারা। সৌদি আরামকোর সঙ্গেও স্বল্প মেয়াদে একটি চুক্তি আছে। এ ছাড়া চাহিদা বুঝে নিয়মিত খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে দরপত্রের মাধ্যমে এলএনজি কেনা হয়। পেট্রোবাংলার তালিকাভুক্ত ২৭টি সরবরাহকারী কোম্পানির মধ্যে এ দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর বাইরে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি ব্যবহার করে ক্রয়াদেশ দিয়েছে সরকার।
.৭ দিনের এলএনজি মজুত রাখার সক্ষমতা দরকার.সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি বোঝা যাচ্ছে না। শীতের আগেই তাই এলএনজি মজুত করছে ইউরোপ। এলএনজি কার্গোর সংকট আছে বিশ্ববাজারেই। তাই দরপত্র বারবার ডাকলেও কার্গো পাওয়া কঠিন হবে। আগামী মাসেও সরবরাহ পেতে ভুগতে হতে পারে।
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যুদ্ধ পুরোপুরি থামলে বিশ্বে জ্বালানির অস্থিরতা কমতে পারে। আপাতত সরকারকে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে হবে। জ্বালানি তেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা যেতে পারে। এখনকার চড়া দামে এলএনজি কেনার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। সব মিলে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।