সিলেটের বিয়ানীবাজারের সুনাই নদীতে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে নৌকাবাইচ বন্ধে দাবি জানানোর খবর পাওয়া গেছে। এর আগেও দেশে নানা ঘটনা, মিছিল, সামাজিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৌহিদি জনতার নামটি বারবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে গত বছর মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পী আবুল সরকারের সমর্থক ও একদল মানুষের সংঘর্ষ এবং গণমাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে নামটি ব্যাপকভাবে খবরের শিরোনাম হয়।

এ ধারাবাহিকতায় সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, এই ‘তৌহিদি জনতা’ আসলে কারা? তারা কি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থক?

তৌহিদি জনতার পরিচয়

তৌহিদি জনতা শব্দটি একটি আরবি ও একটি বাংলা শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। তৌহিদ শব্দটির মূল আরবি শব্দ হলো তাওহিদ। তাওহিদ মানে আল্লাহর প্রতি একত্ববাদ। তৌহিদি হলো যিনি আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করেন। জনতা বাংলা শব্দ, যার অর্থ সাধারণ জনগণ। তৌহিদি জনতা হলো- একত্ববাদের পক্ষের জনগণ।

ইসলাম ধর্মমতে, পৃথিবীর সব মুসলমানরা তাওহিদি জনতার অংশ। কারণ, মুসলমানরা আল্লাহকে বিশ্বাস করেন। কিন্তু যারা নিজের হাতে আইন তুলে নেন, ম্যুরাল পুলিশিং করেন, মানুষকে কোনো কিছু মানতে বাধ্য করেন, অন্যের ওপর বা কারও প্রতিষ্ঠানে হামলা করেন, তারা ইসলামের প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্যশীল মানুষ নয়। কারণ, ইসলাম অন্যের ওপর জুলুম করতে নিষেধ করেছে। কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়াকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসুলকে বিশ্বাস করেন এবং যারা প্রকৃতভাবে ইসলামকে লালন করেন—তারাই তৌহিদি জনতা। তৌহিদি জনতার ব্যানারে বা কোনো দলীয় ব্যানারে অন্যায়ভাবে কারও ওপর আক্রমণ, হামলা বা কাউকে কোনো কিছু মানতে বাধ্য করার সুযোগ নেই। তৌহিদি জনতা মুসলমান। তার কাছে সব মানুষ ও তাদের অধিকার নিরাপদ থাকবে।’

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী মুক্তকণ্ঠকে জানান, ‘বাংলাদেশে বহু বছর ধরে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে এই নামটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কবে থেকে এ শব্দবন্ধের ব্যবহার শুরু হয়েছে, তা বলা কঠিন।’

এদিকে আন্দোলন করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়াকে সম্পূর্ণ অনুচিত বলে মনে করেন জামেয়া মাহমুদিয়া যাত্রাবাড়ি ঢাকার প্রধান মুফতি রেজাউল কারীম আবরার। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। এখানে যে কেউ যে কোনো বিষয়ে আন্দোলন করতে পারেন। তবে আন্দোলন বা তৌহিদি জনতার ব্যানারে ভাঙচুর বা কারও ওপর আক্রমণ করা যাবে না। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা আছে, এটা নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।’

একই সঙ্গে ধর্মবিরোধী কোনো কাজ হলে রাষ্ট্রকে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

কেন এই ব্যানারে আন্দোলন?

মাঠপর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো এলাকায় মাজারপূজা, শিরক, ইসলাম, আল্লাহ, নবী বা কোরআন অবমাননার মতো ঘটনা ঘটলে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানান। তখন তারা কোনো নির্দিষ্ট দলীয় পরিচয় না দিয়ে ‘তৌহিদী জনতার আন্দোলন’ ব্যানারে সংঘবদ্ধ হন।

মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ‘যারা কোনো আন্দোলনে নিজেদের দলীয় পরিচয় দিতে পারে না, তারাই সাধারণ মুসলিম হিসেবে তৌহিদি জনতার ব্যানারে মিছিল বা আন্দোলন করে। তৌহিদি জনতার ব্যানারে প্রতিবাদে নামেন।’

একই ধরনের মতামত দিয়েছেন মুফতি রেজাউল কারীম আবরার। তিনি বলেন, ‘তৌহিদি জনতার ব্যানারে মুসলিমরা জড়ো হয়ে আন্দোলন করেন। এখানে সাধারণ মানুষ থেকে রাজনীতিবিদরাও জড়ো হন। তবে কারও রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। সবাই তৌহিদি জনতা।’

তারা কি কোনো দলের সদস্য

ইসলাম চিন্তাবিদ ও ইসলামি রাজনীতিবিদদের মতে, তৌহিদি জনতা কোনো দলের সদস্য নয়। তারা যখন তৌহিদি জনতার ব্যানারে আন্দোলন করেন, তখন তাদের রাজনৈতিক পরিচয় থাকে না। সেখানে সব দলের লোকজন অংশ নিতে পারেন।

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বলেন, ‘ইসলামবিরোধী কাজ হলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তৌহিদি জনতার ব্যানারে আন্দোলন করেন। মুসলমান হিসেবে সেখানে সবাই যুক্ত হতে পারে। মূলত ব্যাপকতা বোঝানোর জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। তবে এর সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক দলের নেতারা সেখানে থাকতে পারেন।’

তৌহিদি জনতার সঙ্গে কোনো দলের সম্পৃক্ততা নেই বলে মনে করেন মুফতি রেজাউল কারীম আবরার। তিনি বলেন, ‘তৌহিদি জনতা কোনো দলের সদস্য নয়। তারা দলের ব্যানারে আন্দোলন করতে এখানে আসেন না।’

সৎ ও অসৎ কাজের বিষয়ে ইসলামের নিদের্শনা

সৎ কাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের বন্ধু। তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে।’ (সুরা তওবা, আয়াত: ৭১)

আবু সাইদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন খারাপ কাজ হতে দেখে, সে যেন তার হাত দিয়ে বাধা দেয়। যদি সে তাতে সক্ষম না হয়, তাহলে মুখ দিয়ে, যদি সে তাতেও সক্ষম না হয়, তাহলে অন্তর দিয়ে যেন ঘৃণা করে। আর এটা ইমানের সবচেয়ে দুর্বল স্তর।’ (সহিহ মুসলিম)।

এই হাদিস দিয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়, কারও সামনে খারাপ কাজ সংঘটিত হলে সাধ্য অনুযায়ী তা বন্ধের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু কাউকে ধর্মীয় বিধান মানতে বাধ্য করা যাবে না। কারও ওপর কোনো বিষয় মানতে জুলুম করা যাবে না। তৌহিদি জনতার ব্যানারে কোনো বিতর্কিত কাজ ইসলাম সমর্থন করে না।

কিন্তু বেশ কিছু দিন ধরে ‘তৌহিদি জনতা’ ব্যানারে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের উপর হামলা-ভাঙচুরের মতো ঘটনার দাবি করা হয়েছে। এগুলো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি বিশেষের কাজ বলে মনে করেন আলেম সমাজ। তারা মনে করেন, প্রকৃত মুসলিম কোনো অবস্থাতেই অন্যে হক নষ্টের মতো কাজে নিজেও শামিল হবেন না এবং অন্য কাউকে এ ব্যাপারে উৎসাহও দেবেন না।