বাবার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিলিয়ন ডলার, পরিবারের নামে অঢেল সম্পদ—এমন প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অতিধনী পরিবারগুলোর বাবা-মায়ের ঘুম কেড়ে নিয়েছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং চাকরির বাজারের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে উত্তরাধিকার পরিকল্পনা বদলে ফেলতে হচ্ছে তাঁদের। ফরচুন ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বর্তমানে জেন-জি প্রজন্মের লাখো তরুণ বেকারত্বের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে নিয়োগ কমেছে এবং প্রতিযোগিতা বেড়েছে। একসময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা তরুণদের জন্য বরাদ্দ থাকা অনেক কাজ এখন এআই-এর দখলে চলে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার প্রভাব এখন মধ্যবিত্তের গণ্ডি ছাড়িয়ে শতকোটিপতি পরিবারগুলোতেও পৌঁছেছে।
ইউএস ব্যাংকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যাসেন্ট প্রাইভেট ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকার বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টম থিগস বলেন, "শতকোটিপতিরা সন্তানকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেই পারেন, সেটা বিষয় নয়। সন্তানের সফলতার জন্য অর্থের বাইরে আর কী প্রয়োজন—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।"
মায়ামিভিত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান অ্যালাইন্ড বাই নিউএজ ওয়েলথের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্যাট্রিক ডোয়ার সাধারণত ১০ কোটি থেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদের মালিকদের পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, কোটিপতি ও শতকোটিপতিরা বুঝতে পারছেন যে সন্তানদের বর্তমান বাস্তবতা তাঁদের সময়ের মতো নয়। ডোয়ার জানান, তাঁর ক্লায়েন্টদের সন্তানদের বয়স সাধারণত ২২ থেকে ৩৫ বছর। একসময় প্রযুক্তি, আইন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো পেশা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ মনে করা হলেও এখন সেখানেও চাকরি পাওয়া ও ধরে রাখার লড়াই চলছে।
অনেকের মনে হতে পারে, বিপুল সম্পদের মালিকদের এই উদ্বেগ অযৌক্তিক। তবে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের মতে, মূল সমস্যাটি অর্থ নিয়ে নয়। টম থিগস বলেন, "সাধারণত তাঁরা সন্তানের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত নন। তাঁরা ভাবছেন, সন্তানের জীবনের উদ্দেশ্যবোধ, পরিচয় ও আত্মবিশ্বাস তাদের চাকরির বাজারের কী প্রভাব পড়বে।"
বিপুল সম্পদের কারণে সন্তানদের কাজ করার ইচ্ছা কমে যাওয়ার ভয়ও রয়েছে। তাই সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা কেবল অর্থের জোগান দেওয়ার বদলে উত্তরাধিকার ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা এমনভাবে সাজানোর পরামর্শ দিচ্ছেন, যাতে সন্তানরা নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়তে পারে। থিগসের মতে, সন্তানকে শুধু ‘আর্থিক নিরাপত্তা’ দেওয়ার বদলে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেখানে সে শেখার ও নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিডার পয়েন্ট ক্যাপিটাল পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা অংশীদার ট্রেন্ট ভন আহসেন বলেন, "অতিধনী পরিবারগুলোর দুশ্চিন্তা এখন আর্থিক স্থিতিশীলতা নয়; বরং অন্য কিছু। সেটা হলো সন্তানকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাবে কি না, যাতে সে চিরকাল বাবা-মায়ের ওপর নির্ভরশীল না থাকে।"
চাকরির বাজারের এই পরিবর্তন জেন-জির ক্যারিয়ার ভাবনাকেও বদলে দিচ্ছে। ছাঁটাই এবং এআই-এর বিস্তারের কারণে অনেক তরুণ এখন প্রচলিত করপোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে কনটেন্ট নির্মাতা, উৎপাদনশিল্প বা কারিগরি পেশায় ঝুঁকছেন। এমনকি কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী তরুণ বার্ষিক লাখ ডলার বেতনের আয়া বা গৃহশিক্ষকের চাকরি নিচ্ছেন, কারণ সেখানে করপোরেট চাকরির মতো অনিশ্চয়তা নেই।
ডেলয়েটের ২০২৫ সালের বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, জেন-জির মাত্র ৬ শতাংশের লক্ষ্য করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যাওয়া। তাঁদের কাছে ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তি এবং কাজের সাথে জীবনযাত্রার ভারসাম্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতায় শতকোটিপতিরা এখন একবারে বিপুল সম্পদ দেওয়ার বদলে শিক্ষা, সঠিক পরামর্শ এবং ধাপে ধাপে সম্পদ হস্তান্তরের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।