আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ এত অপকর্ম করেছে যে দেশের ভেতরে স্থির থাকতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, “দুনিয়ার ইতিহাস হলো একবার যারা অপকর্মের দায় নিয়ে পালিয়ে যায়, তারা আর ফিরে আসতে পারে না।”

আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযোদ্ধা হলে জাতীয় সীরাত উদ্‌যাপন কমিটির আয়োজনে ‘রাসুল (সা.)–এর নীতি ও আদর্শ’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সীরাতুন্নবী উপলক্ষে রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার যে পথে হেঁটেছে, বর্তমান সরকারও সেই পথ ধরে হাঁটা শুরু করেছে। তিনি বলেন, “এই রাস্তা আয়নাঘর তৈরি, বিনা বিচারে হত্যা, শাপলা চত্বরে আলেমদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার রাস্তা। ফ্যাসিবাদের এই রাস্তা থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।”

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চব্বিশ সালে যে মানুষগুলো জেগে উঠেছিল তারা সবাই মারা যায়নি। তারা ঘুমিয়ে পড়েনি, তারা সজাগ দৃষ্টিতে সবকিছু প্রত্যক্ষ করছে। মূল যুদ্ধের আগে বাহিনী তৈরি হয়, তাদের কসরত করতে হয়, রিহার্সাল দিতে হয়। এরা যেন চব্বিশকে ফাইনাল যুদ্ধ মনে না করে। এটা ছিল ফাইনাল যুদ্ধের রিহার্সাল।”

ফ্যাসিবাদকে একটি সংক্রামক ব্যাধির সঙ্গে তুলনা করে শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের পর ধারণা করা হয়েছিল ফ্যাসিবাদের আবর্জনা পরিষ্কার হবে, কিন্তু তা হয়নি বরং বেড়েছে। তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে যায় না। এটা সংক্রামক ব্যাধি। এই ভাইরাস যার ওপর ভর করবে, সে-ই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠবে।”

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলার বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতির দুঃখের ঘটনাগুলোকে এই জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বিশেষ একটি দেশকে খুশি করার জন্য অনেক উপাদান এখান থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। অনেক নির্যাতিত মানুষের স্মৃতিচিহ্ন ও ছবি জাদুঘরে ছিল। একটি নির্দিষ্ট দলের স্মৃতি রেখে বাকিগুলো গায়েব করে ফেলা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার হোসেন, যাঁর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের বিষয়ে আক্ষেপ করেছিলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তার একটি স্মৃতিচিহ্ন ছিল, সেটিও গায়েব করা হয়েছে। ফেলানীর স্মৃতি গায়েব করা হয়েছে। এটি ভালো লক্ষণ নয়।”

ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন, “ক্ষমতায় এসে সবাই বলে ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস হলো, সবাই ইতিহাস বিকৃতির নায়ক ছিল। এ অপকর্ম থেকে কেউ বেরোতে পারেনি।”

সেমিনারে প্রধান আলোচক হিসেবে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, ঐক্যবদ্ধ না থাকলে শত্রুরা সুযোগ নিতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আলেমরা একে অপরের বিরুদ্ধে গালমন্দ করছেন। এর পেছনে তৃতীয় কোনো শক্তির হাত থাকতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।” তিনি মদিনার আদলে রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরির প্রস্তুতির কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন জাতীয় সীরাত উদ্‌যাপন কমিটির সদস্যসচিব আব্দুল মান্নান এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম আবদুল কাদের। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সীরাত উদ্‌যাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক আ ন ম রফিকুর রহমান মাদানী।

সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শামসুল আলম, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা যাত্রাবাড়ী শাখার অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান মাদানী এবং শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম।