দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত কমার ধারাটি এখনও স্থিতিশীল করা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা (আন্তব্যাংক ও ইডিএফ বাদে)। গত বছরের একই সময়ে যা ছিল ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০১ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে অধিকাংশ সূচকে মিশ্র প্রবণতার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে আমানত ও প্রবাসী আয়—দুই ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক হিসেবে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইসলামি ধারার ১০ ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হচ্ছে। ফলে ওই পাঁচ ব্যাংক এখনো আস্থাহীনতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের দুর্বল পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়ছে আমানত প্রবাহে। ওই পাঁচ ব্যাংকে আমানতকারীদের জমানো টাকার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা, যা ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় রাখা মোট আমানতের প্রায় ৩৬ শতাংশের বেশি।
এ অবস্থায় ওই পাঁচ ব্যাংকে গ্রাহকদের আমানত রাখার আগ্রহ কমে আসছে বলে উল্লেখ করা হয়। আরও বলা হয়, সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তোলার সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায়। এতে আমানত আটকে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পর্যবেক্ষকরা। ফলে উল্টো এসব ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতাই বেশি হতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়া সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওই পাঁচ ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাটের অভিযোগের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। পাশাপাশি সমালোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে বলেও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবাসীদের অনেকের মধ্যেও এসব ব্যাংকে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে অনাগ্রহ থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। কারণ, রেমিট্যান্সের অর্থ ঠিকমতো তোলা যাবে কি না—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। একইভাবে যে কোনো ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি মজবুত না হলে গ্রাহকেরা আমানত রাখতে নিরুৎসাহিত হন বলেও বলা হয়েছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমানতকারীরা এখনো মুদারাবাভিত্তিক আমানত স্কিমগুলোর ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভর করছেন, যা মোট ইসলামি ব্যাংকিং আমানতের প্রায় ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানতের মূল উৎস বেসরকারি খাত—যা মোট আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ।
তবে আমানত কমলেও এর মধ্যে ভালো করছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমানতে ১১ শতাংশ ও বিনিয়োগে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আছে। পরিচালন মুনাফায় প্রবৃদ্ধি আছে ১৫ শতাংশ। ঋণ-বিনিয়োগ অনুপাত ৯২ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, তবে এখন ৮২১ শতাংশ আছে। এখনো ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার মতো তহবিল আছে।"
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ আরও বলেন, "বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনুকূলে না। তাই অনেক বুঝেশুনে বিনিয়োগের চিন্তা করছেন বিনিয়োগকারীরা। আমানতকারীদের কাছ ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।"
প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জুন মাসে উল্লেখযোগ্য পতনের তথ্য এসেছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে এসেছে মাত্র ৪৪ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের জুনে এসেছিল ৬০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স কমেছে প্রায় ২৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
বৈদেশিক বাণিজ্যের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ডলার, গত বছরের জুনে ছিল ৫৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অন্যদিকে গত জুনে আমদানি ব্যয় হয়েছে ৭৫ কোটি ডলার, যা ২০২৫ সালের জুনে ছিল ৭৪ কোটি ডলার।
আমানত কমলেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোর ইতিবাচক ধারা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে এসব ব্যাংকগুলোর মোট বিনিয়োগের (সুকুক বা ইসলামি বন্ডসহ) পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জুনে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট বিনিয়োগের বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে শিল্প খাতে, যা ৪১ শতাংশের বেশি। আর ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিনিয়োগ ৩০ শতাংশের বেশি।
কর্মসংস্থানেও পরিবর্তনের তথ্য রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন শেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকগুলোতে কর্মরত ছিলেন মোট ৪২ হাজার ৬১২ জন। ২০২৫ সালের জুনে ছিল ৪৬ হাজার ৪৬৮ জন—অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ৩ হাজার ৮৫৬ জন কর্মী কমেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত দুই বছরের নানা অস্থিরতা, আগের নিয়োগগুলো যাচাই-বাছাইসহ নানা কারণে জনবল কমেছে।
বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক রয়েছে, যাদের মোট ১ হাজার ৭০০ শাখা। ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসি ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক।
এর মধ্যে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হচ্ছে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে। আর্থিক সংকটে থাকা এসব ব্যাংককে ব্যাংক রেজোল্যুশন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূত পাঁচ ব্যাংকের নেটওয়ার্ক নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আওতায় রয়েছে সারা দেশে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট ও ৯৭৫টি এটিএম বুথ।