আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো বাড়ছে। ডলারের দরপতন, যুক্তরাষ্ট্রের সুদহার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সোনার চাহিদা বাড়ার প্রভাবে গতকাল শুক্রবার স্পট মার্কেটে দাম তিন মাসের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে সোনার দাম ২০০ দিনের গড় দামের ৪ হাজার ৫১৩ ডলার অতিক্রম করেছে। এই অবস্থার পর সোনার দাম নিয়ে বাজারে আরও প্রত্যাশা তৈরি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের বাজারেও সোনার দাম বাড়ছে। গত তিন দিনে দুবার বাড়ানো হয়েছে সোনার দাম। ফলে সোনার ভরি আবার ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অতিক্রম করেছে।
গতকাল স্পট মার্কেটে সোনার দাম একপর্যায়ে ৪ হাজার ৬৩১ ডলার ৯৯ সেন্টে ওঠে, যা গত ১৫ মের পর সর্বোচ্চ। গত সপ্তাহে সোনার দাম বেড়েছে ৫ শতাংশের বেশি, আউন্সপ্রতি প্রায় ৯০ ডলার। গোল্ড প্রাইস ডট অর্গের তথ্য অনুসারে, গত এক মাসে সোনার দাম বেড়েছে আউন্সপ্রতি প্রায় ৪৬৬ ডলার বা ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ।
দাম বাড়ার ধারায় পরিবর্তন এসেছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার দাম সাধারণত বাড়ে—তবে সম্প্রতি তাতে ব্যতিক্রম দেখা গেলেও এখন আবার দাম বাড়ছে বলে পর্যবেক্ষণ রয়েছে।
সোনার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ডলারের দুর্বল হওয়া দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ড পুনঃক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানোর যে পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, এরপর ডলারের দর কমেছে। তবে এ বিষয়ে বাজারে এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, বন্ড বাজারে সরকারের এ ধরনের হস্তক্ষেপের কারণে শেষ পর্যন্ত ডলারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে।
ডলারের দর কমলে ডলারে নির্ধারিত সোনার দাম বিদেশি ক্রেতাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে ওঠে। এতে সোনার চাহিদা বাড়ে এবং দামের ওপর প্রভাব পড়ে।
এ ছাড়া বাজারের কিছু ইঙ্গিতের কারণেও দাম বাড়ছে। চলতি সপ্তাহে সোনার দাম ২০০ দিনের গড় দামের প্রায় ৪ হাজার ৫১৩ ডলার অতিক্রম করেছে। বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই স্তর অতিক্রম করা সোনার দামের জন্য ইতিবাচক সংকেত। ফলে বিনিয়োগকারীদের অর্থ নতুনভাবে সোনার বাজারে প্রবেশ করছে।
টিডি সিকিউরিটিজের কমোডিটি স্ট্র্যাটেজির বৈশ্বিকপ্রধান বার্ট মেলেক বলেন, সোনার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে এই বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই গতি অব্যাহত থাকলে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৭০০ ডলারে উঠতে পারে। তবে ডলারের দরপতনও সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ।
এদিকে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদহার নিয়ে বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। জুলাইয়ে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। অর্থনীতি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ায় ভবিষ্যতে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা কমেছে বলেও প্রতিবেদনে এসেছে। সুদের হার কম বা অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা বাড়লে সোনায় বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়ে বলে ব্যাখ্যা করা হয়। কারণ হলো, সোনার সুদবিহীন সম্পদ।
গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছে, সম্প্রতি সোনার কল অপশনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কল অপশন হলো এমন ধরনের আর্থিক চুক্তি, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট দামে সম্পদ কেনার অধিকার পান। তবে কিনতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা থাকে না। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার বিপক্ষে সুরক্ষা হিসেবে সোনা ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। একই সঙ্গে সোনাভিত্তিক এক্সচেঞ্জ–ট্রেডেড ফান্ডের (ইটিএফ) চাহিদাও বেড়েছে। এসব কারণে দাম ঊর্ধ্বমুখী, অর্থাৎ দাম কেবল বাড়ছে।
একধাপে সোনার দাম বাড়ল ভরিতে ৫,৪৮২ টাকা।
সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় ভারতে খুচরা পর্যায়ে চাহিদা কিছুটা কমেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় সোনার বাজার চীনের চাহিদা মোটামুটি স্থিতিশীল। পোল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জুলাইয়ে সোনা কেনার পরিমাণ কমিয়ে ৭ দশমিক ৮ টনে নামিয়েছে।
গতকাল অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামও বেড়েছে। স্পট মার্কেটে রুপার দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৬৯ ডলার ৬২ সেন্টে উঠেছে। প্ল্যাটিনামের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে।